সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা, অধিকার, মর্যাদা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার প্রত্যয় নিয়ে নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে সাংবাদিক সুরক্ষা ও কল্যাণ ফাউন্ডেশনের ৫ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপিত হয়েছে। রাজধানীর তথ্য ভবনের তৃতীয় তলায় বুধবার (১৯ আগস্ট) আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত সাংবাদিক, সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, বুদ্ধিজীবী ও বিশিষ্টজনদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানটি এক প্রাণবন্ত মিলনমেলায় পরিণত হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদিন এমপি। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা হাবীবুর রহমান হাবীব এবং রামগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. মজিবুল হক মজু। সাংবাদিক সুরক্ষা ও কল্যাণ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মো. দেলোয়ার হোসেনের সভাপতিত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা, স্বাধীন ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, সাংবাদিকদের অধিকার এবং কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়। প্রধান অতিথির বক্তব্যে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশে গণমাধ্যম বর্তমানে সর্বোচ্চ স্বাধীনতা ভোগ করছে। সাংবাদিকরা যাতে নির্বিঘ্নে ও স্বাধীনভাবে তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে পারেন, সে পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী এবং সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ তৈরিতে সরকার কাজ করছে।
তবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সুযোগ যেন অপসাংবাদিকতা, মিথ্যা সংবাদ, অপপ্রচার কিংবা ব্ল্যাকমেইলিংয়ের মতো কর্মকাণ্ডে ব্যবহার না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভুয়া নিউজ পোর্টাল ব্যবহার করে অপপ্রচার ও চাঁদাবাজির অভিযোগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধ করা প্রয়োজন। এতে প্রকৃত ও পেশাদার সাংবাদিকদের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
রাজনীতি ও সাংবাদিকতার সম্পর্ক প্রসঙ্গে তথ্যমন্ত্রী বলেন, রাজনীতির মূল লক্ষ্য জনগণের সেবা করা এবং সাংবাদিকদের দায়িত্ব হলো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা জনগণের কল্যাণে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা ও প্রয়োজনীয় প্রশ্ন তুলে ধরা। একই সঙ্গে সাংবাদিকতার আড়ালে কোনো অনৈতিক কর্মকাণ্ড হলে তা চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি তুলে ধরেন। সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক, অনলাইন ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মসহ গণমাধ্যমের সব ক্ষেত্রকে নিয়ে একটি আধুনিক, স্বচ্ছ ও সুস্থ ডিজিটাল মিডিয়া ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে কাজ চলছে। এ লক্ষ্যে সংবাদপত্রের মালিক, সম্পাদক ও সাংবাদিক নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও এ ধরনের আলোচনা অব্যাহত থাকবে। প্রধান আলোচক অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদিন এমপি সাংবাদিক সুরক্ষা ও কল্যাণ ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করে বলেন, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও কল্যাণে ফাউন্ডেশনের উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাংবাদিকদের পেশাগত মর্যাদা ও নিরাপত্তা রক্ষায় এ ধরনের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার আহ্বান জানান তিনি। বিশেষ অতিথি হাবীবুর রহমান হাবীব বলেন, সাংবাদিকতা একটি মহৎ ও দায়িত্বশীল পেশা। রাষ্ট্র ও সমাজের সর্বস্তরের মানুষের উচিত সাংবাদিকদের যথাযথ সম্মান দেওয়া এবং তারা যাতে স্বাধীন ও নিরাপদ পরিবেশে দায়িত্ব পালন করতে পারেন, সে বিষয়ে সহযোগিতা করা। অনুষ্ঠানে বক্তারা সাংবাদিকতাকে আধুনিক শ্রম ও শিল্প আইনের আওতায় এনে পেশাটিকে একটি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। সাংবাদিকদের পেশাগত মর্যাদা, নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে সাংবাদিক সুরক্ষা ও কল্যাণ ফাউন্ডেশনকে আরও কার্যকর ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তারা। পাশাপাশি দায়িত্ব পালনকালে হামলা, হয়রানি, মামলা কিংবা অন্য কোনো ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়া সাংবাদিকদের জন্য জরুরি সহায়তা তহবিল গঠন ও আইনি সহায়তার পরিধি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অন্যতম মানবিক কর্মসূচি ছিল প্রয়াত সাংবাদিকদের পরিবারের সদস্যদের হাতে আর্থিক সহায়তার চেক তুলে দেওয়া। একই সঙ্গে অসহায়, অসুস্থ ও আর্থিক সংকটে থাকা সাংবাদিকদের মধ্যেও আর্থিক ও মানবিক সহায়তা প্রদান করা হয়। বক্তারা বলেন, একজন সাংবাদিকের মৃত্যুর পর তার পরিবারের পাশে দাঁড়ানো পুরো সাংবাদিক সমাজের মানবিক দায়িত্ব। প্রয়াত সাংবাদিকদের পরিবার এবং অসহায় ও অসুস্থ সাংবাদিকদের জন্য এ ধরনের সহায়তা কার্যক্রম ভবিষ্যতে আরও বৃহৎ পরিসরে পরিচালনার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।
অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তার বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব পায়। বক্তারা বলেন, প্রতিকূল পরিবেশে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে গণমাধ্যমকর্মীরা বিভিন্ন সময় হামলা, মামলা, হয়রানি, ভয়ভীতি ও নানা ধরনের ঝুঁকির সম্মুখীন হন। এসব পরিস্থিতিতে সাংবাদিকদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য কার্যকর সাংগঠনিক ব্যবস্থা, জরুরি সহায়তা এবং আইনি সহযোগিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কোনো ধরনের ভয়ভীতি বা বাধা ছাড়াই সত্য, ন্যায় ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশে সাংবাদিকদের পাশে থাকার অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
৫ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন জেলার কমিটি অনুমোদন করা হয়। পাশাপাশি সাংবাদিকতা, সমাজসেবা, মানবিক কর্মকাণ্ডসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য আমন্ত্রিত অতিথি ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সংগঠনের মহাসচিব তালুকদার রুমি। এ সময় সংগঠনের ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল মামুন, ডেইলি প্রেজেন্ট টাইমস-এর প্রধান সম্পাদক মো. ওমর ফারুক জালাল, দৈনিক ফলাফল-এর সম্পাদক মো. মোস্তাফিজুর রহমান, দুর্নীতি প্রতিরোধ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান তাজুল ইসলাম হিরু, দৈনিক বঙ্গ সংবাদ-এর সম্পাদক ও প্রকাশক ডা. মির্জা, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোঃ মনিরুজ্জামান তোফায়েল, সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ মিরাজ হোসেন, সমাজকল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক মোঃ সনোয়ার হোসেন, দৈনিক মুক্তির লড়াই পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক কামরুজ্জামান রনি, মহিলা বিষয়ক সম্পাদক ও দৈনিক নবজীবন পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক নুরুন্নাহার, মারিয়া ইসলাম, সারহিন আক্তার, দীপা আক্তার এবং কাজী রোকেয়া আক্তার কেয়াসহ সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা ও থানা কমিটির নেতৃবৃন্দ অনুষ্ঠানে অংশ নেন। বাংলাদেশ সাংবাদিক ঐক্য পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান সাব্বির আহম্মেদ রনি, আরজেএফ-এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান জহিরুল ইসলাম, বিএনএন নিউজের চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলামসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিক ও সংগঠনের নেতৃবৃন্দ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য র্যালি, কেক কাটা, আলোচনা সভা, সম্মাননা প্রদান, প্রয়াত সাংবাদিকদের পরিবারের মধ্যে সহায়তার চেক বিতরণ এবং অসহায় ও অসুস্থ সাংবাদিকদের আর্থিক ও মানবিক সহায়তা প্রদানসহ বিভিন্ন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। অতিথি ও অংশগ্রহণকারীদের জন্য সকাল, দুপুর ও বিকেলে খাবারের ব্যবস্থাও রাখা হয়। বিভিন্ন পর্বে সাংবাদিকদের কল্যাণে ফাউন্ডেশনের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়েও আলোচনা করা হয়।
অনুষ্ঠানের শেষপর্বে অনুষ্ঠিত হয় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সাংবাদিকদের অধিকার, পেশাগত নিরাপত্তা, মর্যাদা ও কল্যাণে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখার প্রত্যয় নিয়ে সাংবাদিক সুরক্ষা ও কল্যাণ ফাউন্ডেশনের ৫ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর বর্ণাঢ্য আয়োজনের সমাপ্তি ঘটে।
ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, গত পাঁচ বছর ধরে সাংবাদিকদের অধিকার, নিরাপত্তা ও কল্যাণে সাংবাদিক সুরক্ষা ও কল্যাণ ফাউন্ডেশন নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আগামী দিনে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সমুন্নত রাখা, সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সাংবাদিক ও তাদের পরিবারের জীবনমান উন্নয়নে ফাউন্ডেশন আরও যুগান্তকারী ও কল্যাণমুখী কর্মসূচি গ্রহণ করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

