বাংলাদেশকে উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত করতে দেশে ও বিদেশে অবস্থানরত সব নাগরিককে নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি মনে করেন, দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার কাজে সম্মিলিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে তার সুফল ভোগ করবেন দেশের সব মানুষ, প্রবাসীরাও এর বাইরে থাকবেন না।
জাপানের রাজধানী টোকিওর নিউ ওতানি হোটেলে বুধবার সন্ধ্যায় প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। সভায় প্রবাসীরা তাঁদের বিভিন্ন সমস্যা ও প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন। জবাবে প্রধানমন্ত্রী শিক্ষা, চিকিৎসা, বিদেশি ভাষা শিক্ষা এবং জাপানের শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে সরকারের পরিকল্পনার বিভিন্ন দিক ব্যাখ্যা করেন। এ সময় তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের কল্যাণে কাজ করার দায়িত্ব সবার। কেউ দেশে থাকেন, কেউ বিদেশে—কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে প্রত্যেকেরই অবদান রাখার সুযোগ রয়েছে। দেশের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে, এমন উদ্যোগ গ্রহণে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
বিদেশি ভাষা শিক্ষায় গুরুত্ব
শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণে বিদ্যালয় পর্যায় থেকেই বিদেশি ভাষা শেখানোর পরিকল্পনার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক শিক্ষার ভিত মজবুত করার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ইংরেজির বাইরে আরও একটি বিদেশি ভাষা শেখার সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে সরকার কাজ করছে।
এ ক্ষেত্রে জাপানি, জার্মান ও ফরাসি ভাষাসহ কয়েকটি ভাষা অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। শিক্ষার্থীরা নিজেদের পছন্দ অনুসারে ভাষা নির্বাচন করতে পারবে। এ বিষয়ে পরিকল্পনা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে এবং আগামী বছর থেকে বিদ্যালয়গুলোতে এ কার্যক্রম চালুর প্রত্যাশা রয়েছে বলে তিনি জানান।
শিক্ষাকে শুধু শ্রেণিকক্ষ ও পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমিত না রেখে খেলাধুলা, শিল্পকলা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করার ওপরও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসারের কথা উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর মতে, ভাষাগত দক্ষতা, ব্যবহারিক জ্ঞান এবং সহশিক্ষা কার্যক্রমে পারদর্শিতা অর্জন করতে পারলে শিক্ষার্থীদের সামনে দেশ-বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও চাকরির সম্ভাবনা আরও বিস্তৃত হবে।
উপজেলা হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা
দেশের স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে জাপানের অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা কাজে লাগানোর বিষয়ে আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়া সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। বিশেষ করে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী, নারী ও শিশুদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে তৃণমূল পর্যায়ে আরও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, বর্তমানে উপজেলা হাসপাতালগুলোতে ৫০টি শয্যা রয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে এসব হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা ১৫০টিতে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি উপজেলা পর্যায়ে ডায়ালাইসিস সেবা চালু এবং নারী ও শিশুদের জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসাসুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, স্থানীয় পর্যায়ে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ বাড়ানো গেলে গ্রামের রোগীদের চিকিৎসার জন্য জেলা কিংবা বিভাগীয় শহরে যাওয়ার প্রয়োজন কমবে। একই সঙ্গে বড় হাসপাতালগুলোতে রোগীর অতিরিক্ত চাপ হ্রাস পাবে এবং জটিল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা সহজ হবে।
এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের উদ্যোগ
চিকিৎসার পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধিকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, গ্রাম পর্যায়ে স্বাস্থ্যসচেতনতা ছড়িয়ে দিতে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রস্তাবিত এই কর্মসূচিতে অন্তত ৮০ শতাংশ নারীকে নিয়োগ দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, স্বাস্থ্যকর্মীরা মানুষের বাড়িতে গিয়ে স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন, পুষ্টি এবং ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধের বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে কাজ করবেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষকে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনে উৎসাহিত করা গেলে বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে। এতে চিকিৎসাসেবার ওপর বিদ্যমান চাপও হ্রাস পাবে।
জাপানের শ্রমবাজারে দক্ষ কর্মী পাঠানোর ওপর জোর
জাপানে কর্মরত বাংলাদেশিদের ভাষাগত দক্ষতা এবং কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের সুনাম ধরে রাখতে কর্মীদের দক্ষতা বাড়ানো অপরিহার্য। বিশেষ করে জাপানে কাজ করতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের যথাযথ প্রশিক্ষণ, জাপানি ভাষার জ্ঞান এবং দেশটির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা দিয়ে প্রস্তুত করতে হবে।
তাঁর মতে, কর্মীদের মানসম্মত প্রশিক্ষণ দিয়ে বিদেশে পাঠানো গেলে জাপানের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করা সম্ভব হবে। এ জন্য ভাষাশিক্ষা ও কর্মমুখী প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান তিনি।
জাপানি ভাষায় দক্ষ প্রবাসীদের বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে যুক্ত করার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়নে আগ্রহী ব্যক্তিদের এগিয়ে আসা প্রয়োজন। জাপানি ভাষার শিক্ষক নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হলেও প্রত্যাশার তুলনায় কম আবেদন জমা পড়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, জাপানি ভাষায় পারদর্শী প্রবাসীরা শিক্ষা মন্ত্রণালয় অথবা প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাঁদের দক্ষতা কাজে লাগানোর সম্ভাব্য উপায় নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।
প্রবাসীদেরও রয়েছে দেশের অগ্রগতিতে ভূমিকা
মতবিনিময় সভায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের দেশের উন্নয়ন কার্যক্রমে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিদেশে বসবাস করলেও তাঁরা বাংলাদেশের নাগরিক। দেশের অগ্রগতি ও মানুষের কল্যাণে তাঁদের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান এবং দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিক্ষার প্রসার, স্বাস্থ্যসেবার মান বৃদ্ধি এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির মতো বিষয়গুলোতে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন। দেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে প্রত্যেককে নিজের অবস্থান থেকে কাজ করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
জাপান বিএনপির সভাপতি মীর রেজাউল করিম রেজার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় সংগঠনটির নেতাকর্মী এবং জাপানপ্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

