ঢাকাসোমবার , ৩১ আগস্ট ২০২৬
  1. অনুসন্ধান প্রতিবেদন
  2. আইন ও অপরাধ
  3. আন্তর্জাতিক
  4. ইসলাম ও জীবন
  5. কৃষি ও অর্থনীতি
  6. খোঁজ-খবর
  7. জাতীয়
  8. জেলার খবর
  9. তথ্য প্রযুক্তি
  10. দুর্নীতি
  11. নগর ও মহানগর
  12. নির্বাচনীয় খবর
  13. পার্শ্ববর্তী দেশ
  14. ফিচার
  15. ফেসবুক থেকে
আজকের সর্বশেষ সবখবর

রক্তের সিঁড়ি পেরিয়ে যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন ও বাস্তবায়ন হল 

আনিস প্রধান, বিশেষ প্রতিনিধি :
আগস্ট ৩১, ২০২৬ ১০:৪৩ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

একটি জাতির ইতিহাসে এমন কিছু সময় আসে, যখন মানুষ কথা বলতে চায় কিন্তু কণ্ঠে ভয় জমে থাকে। প্রতিবাদ করতে চায় কিন্তু চারপাশের দেয়াল তাকে থামিয়ে দেয়। স্বপ্ন দেখতে চায় কিন্তু বাস্তবতার অন্ধকার সেই স্বপ্নকে বারবার গ্রাস করে। বাংলাদেশও এমন এক সময় পার করেছে। দীর্ঘ প্রায় দেড় দশকের বেশি সময় ধরে দেশের রাজনীতি, গণতন্ত্র, বিরোধী মত, প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নিয়ে নানা প্রশ্ন, অভিযোগ ও বিতর্ক জমতে জমতে একসময় জনমনে তৈরি হয়েছিল গভীর হতাশা। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর মামলা-হামলা, গ্রেপ্তার, গুম ও দমন-পীড়নের অভিযোগ যেমন ছিল, তেমনি ছিল ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ। এক পর্যায়ে মনে হচ্ছিল এই অন্ধকারের শেষ কোথায়? বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো আন্দোলন করেছে, রাজপথে নেমেছে, আবার নানা চাপ ও দমন-পীড়নের মুখে পিছিয়েও গেছে। সাধারণ মানুষও ধীরে ধীরে রাজনীতির সংঘাত থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে। মুখে কথা থাকলেও অনেকের কণ্ঠে ছিল নীরবতা।
মনে হচ্ছিল, সম্ভাবনার সূর্য বুঝি অস্তমিত। ঠিক তখনই ইতিহাস তার নতুন চরিত্রকে সামনে নিয়ে এল।
ছাত্র। যে ছাত্রকে আমরা এতদিন মোবাইল-আসক্ত প্রজন্ম বলে উপহাস করেছি, যে প্রজন্মকে নিয়ে অভিভাবকেরা ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত ছিলেন, সেই তরুণরাই একদিন রাজপথে দাঁড়িয়ে প্রমাণ করল—প্রয়োজনে তারাই পারে ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিতে। যে প্রজন্মকে অবহেলা করা হয়েছিল আজকের তরুণদের জীবন প্রযুক্তিনির্ভর। হাতে স্মার্টফোন, চোখে স্ক্রিন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ সময়—এসব নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। অনেকে বলতেন, তারা মাঠে যায় না, বই পড়ে না, ধৈর্য ধরে কোনো কিছু শুনতে চায় না। অনলাইন গেমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় কাটাতে পারে, অথচ একটি জ্ঞানমূলক লেখা পড়তে কয়েক মিনিটও যেন তাদের কাছে দীর্ঘ সময়।
কিন্তু আমরা ভুলে গিয়েছিলাম—
প্রযুক্তির যুগে বেড়ে ওঠা মানেই সাহসহীন প্রজন্ম নয়।
২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন সেই ভুল ধারণার অবসান ঘটায়। কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ক্রমেই বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ নেয়। সংঘর্ষ, প্রাণহানি, গ্রেপ্তার ও দমন-পীড়নের ঘটনাগুলো পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে।
একজন পড়ে গেলে আরেকজন সামনে আসে।
একজন আহত হলে অন্যজন তার জায়গা নেয়।
ভয় দেখানো হলে তারা আরও দৃঢ় হয়।
তখনই দেশের মানুষ বুঝতে শুরু করল—
এই প্রজন্মকে হয়তো আমরা চিনতেই পারিনি।
যখন সন্তান রাজপথে, তখন ঘরে ঘরে আতঙ্ক
প্রথমদিকে সন্তানদের আন্দোলনে যাওয়ায় অনেক বাবা-মা আতঙ্কিত ছিলেন। তাদের একটাই ভয়—সন্তানটি নিরাপদে ঘরে ফিরবে তো? কিন্তু সময় যত গড়িয়েছে, সন্তানদের সাহস ততই অভিভাবকদের ভয়কে ছাপিয়ে গেছে। যে বাবা সন্তানকে রাজপথে যেতে নিষেধ করেছিলেন, তিনিই একসময় সন্তানের পাশে দাঁড়িয়েছেন।
যে মা সারাদিন সন্তানের ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন, তিনিই সন্তানের আত্মত্যাগের গল্প শুনে চোখের পানি মুছেছেন।
এভাবেই শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ধীরে ধীরে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে পরিণত হয়।
সেনা মোতায়েন—তবুও থামেনি জনতার স্রোত
আন্দোলনের উত্তাল সময়ে সারাদেশে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়। সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হয় নতুন উদ্বেগ। তাহলে কি এবার থেমে যাবে সব?
কিন্তু ইতিহাসের চাকা তখন অন্যদিকে ঘুরছে।
নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে নানা আলোচনা, সেনাসদস্যদের একটি অংশের অবস্থান এবং পরবর্তীতে রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তির ব্যাপক সম্পৃক্ততা আন্দোলনকে নতুন মাত্রা দেয়।
শেষ পর্যন্ত রাজপথে সৃষ্টি হয় গণজোয়ার।
৫ আগস্ট ২০২৪—বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যুক্ত হয় এক নাটকীয় দিন। শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশত্যাগ করেন।
একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়ের অবসান ঘটে।
বাংলাদেশে আসে পরিবর্তনের নতুন প্রত্যাশা।
কিন্তু বিজয়ের পরও কি শেষ হয়েছে লড়াই?
এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
একটি সরকারের পতন মানেই কি কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের পূর্ণ বাস্তবায়ন?
নাকি এটি কেবল একটি নতুন অধ্যায়ের শুরু?
কারণ ক্ষমতা পরিবর্তন করা তুলনামূলক সহজ; ক্ষমতার সংস্কৃতি পরিবর্তন করা অনেক কঠিন।
পুরোনো সুবিধাভোগী কাঠামো, স্বার্থের রাজনীতি, দুর্নীতি, দলীয়করণ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সংস্কৃতি যদি নতুন নামে ফিরে আসে, তাহলে জুলাইয়ের আত্মত্যাগের প্রকৃত মূল্য কোথায়? আজ তাই শুধু আওয়ামী লীগ বা কোনো একটি রাজনৈতিক দলকে প্রশ্ন করার সময় নয়। প্রশ্ন করতে হবে সব রাজনৈতিক শক্তিকে।
বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টি কিংবা নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক শক্তি—কেউই প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়।
যারা জুলাইয়ের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখিয়েছেন, তাদের প্রত্যেকের কাছে জনগণের জবাবদিহি প্রত্যাশা স্বাভাবিক।
‘শেখ হাসিনা আসবে, বাংলাদেশ হাসবে’—এই প্রচারণার অর্থ কী? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখনো শেখ হাসিনাকে ঘিরে নানা ধরনের প্রচারণা দেখা যায়। কেউ তা রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখেন, কেউ দেখেন নিছক রাজনৈতিক প্রচারণা হিসেবে।
কিন্তু বিষয়টিকে হালকাভাবে নেওয়ারও সুযোগ নেই।
কারণ কোনো রাজনৈতিক শক্তি তখনই আবার মাথা তুলে দাঁড়ানোর সুযোগ পায়, যখন নতুন ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা কমতে শুরু করে।
তাই নতুন বাংলাদেশকে টিকিয়ে রাখার সবচেয়ে বড় অস্ত্র কোনো ব্যক্তি বা দলের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নয়।
অস্ত্র হলো—ন্যায়বিচার, সুশাসন, জবাবদিহি এবং জনগণের আস্থা।
জুলাইয়ের রক্ত যেন কারও ব্যক্তিগত সম্পদ না হয়
জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় বিপদ এখানেই।
যে আন্দোলন ছিল অধিকার ও পরিবর্তনের জন্য, সেটি যদি কারও ব্যক্তিগত ক্ষমতা, অর্থ বা রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সিঁড়ি হয়ে যায়, তাহলে সেই আন্দোলনের আত্মা আহত হবে।কেউ্য যদি ছাত্রদের রক্তকে ব্যবহার করে রাতারাতি ক্ষমতাবান হয়ে ওঠে, তাহলে তাকে প্রশ্ন করতেই হবে।
কেউ যদি জনগণের ত্যাগকে নিজের রাজনৈতিক সম্পদ বানাতে চায়, তাকেও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
কারণ—
জুলাই কারও একার নয়।
জুলাই কোনো দলের একার নয়।
জুলাই ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষের জেগে ওঠার নাম।
‘বাঘের ঘরে ঘোগের বাসা’ যেন না হয়
একটি পুরোনো প্রবাদ আছে—বাঘের ঘরে ঘোগের বাসা।
পুরোনো অন্যায়কে সরিয়ে যদি নতুন অন্যায় জায়গা করে নেয়, তাহলে পরিবর্তনের অর্থই হারিয়ে যায়।
আজকের বাংলাদেশে সবচেয়ে প্রয়োজন তাই সতর্ক থাকা।
যারা পুরোনো ক্ষমতার সঙ্গে ছিলেন, তারা যদি নতুন পোশাকে ফিরে আসেন—তাদেরও প্রশ্ন করতে হবে।
যারা নতুন বাংলাদেশ গড়ার কথা বলে ক্ষমতায় যাবেন, তাদেরও জনগণের সামনে হিসাব দিতে হবে।
কারণ মানুষ আর শুধু স্লোগান শুনতে চায় না।
মানুষ দেখতে চায়—
ন্যায়বিচার হয়েছে কি না।
দুর্নীতি কমেছে কি না।
প্রশাসন নিরপেক্ষ হয়েছে কি না।
মানুষ নিরাপদে কথা বলতে পারছে কি না।
সাংবাদিক স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে কি না।
তরুণদের ভবিষ্যৎ নিরাপদ হয়েছে কি না।
শেষ কথা
জুলাই আমাদের শিখিয়েছে—একটি জাতিকে চিরদিন ভয় দেখিয়ে রাখা যায় না।
নীরব মানুষ একদিন কথা বলে।
ভীত মানুষ একদিন রাজপথে নামে।
আর যে তরুণকে আমরা অবহেলা করি, সেই তরুণই একদিন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিতে পারে।
তাই আজ প্রয়োজন নতুন কোনো প্রতিশোধের রাজনীতি নয়; প্রয়োজন নতুন রাষ্ট্রচিন্তা।
যে বাংলাদেশে ক্ষমতা হবে জনগণের সেবা করার দায়িত্ব, লুটপাটের সুযোগ নয়।
যে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিচয় নয়, যোগ্যতা হবে মানুষের মূল্যায়নের ভিত্তি।
যে বাংলাদেশে সাংবাদিক প্রশ্ন করলে তাকে শত্রু ভাবা হবে না।যে বাংলাদেশে ছাত্রের রক্ত কোনো নেতার ক্ষমতার সিঁড়ি হবে না। জুলাইয়ের শহীদদের প্রতি এটাই হতে পারে সবচেয়ে বড় সম্মান। কারণ তারা শুধু একটি সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়নি—তারা দাঁড়িয়েছিল ভয়, অন্যায় ও অধিকারহীনতার বিরুদ্ধে।
তাই আজও প্রশ্নটা থেকেই যায়—
জুলাই কি শুধু ক্ষমতার পালাবদল, নাকি সত্যিই একটি নতুন বাংলাদেশের জন্ম? উত্তরটি এখন আমাদের হাতেই।
আর সেই উত্তর যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বলতে না হয়—
“রক্ত দিয়েছিলাম বাংলাদেশ বদলাতে, অথচ বদলে গেল শুধু ক্ষমতার চেয়ার।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।