জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব জোরদার, বাংলাদেশে বড় বিনিয়োগের সম্ভাবনা
আগামী পাঁচ বছরে এক লাখ কোটি ইয়েন পর্যন্ত জাপানি বেসরকারি বিনিয়োগের সম্ভাবনা, তৈরি হতে পারে দুই লাখ কর্মসংস্থান
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক জাপান সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহযোগিতায় নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশের উন্নয়ন কার্যক্রমে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে পাশে থাকার প্রত্যয় জানিয়েছে জাপান।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত চার দিনের জাপান সফরের অর্জন ও বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির।
তিনি জানান, দীর্ঘদিনের উন্নয়ন সহযোগিতাকে এবার আরও বিস্তৃত অর্থনৈতিক ও বিনিয়োগ অংশীদারিত্বে রূপ দেওয়ার বিষয়ে দুই দেশ গুরুত্ব দিয়েছে। বিশেষ করে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে সম্মান ও সমতার ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা। প্রচলিত ঋণ ও সহায়তার পাশাপাশি বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও কার্যকর করতে চায় সরকার।
পাঁচ বছরে বড় বিনিয়োগের সম্ভাবনা
সফরের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হিসেবে আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে সর্বোচ্চ এক লাখ কোটি ইয়েন, যা প্রায় ৬৩০ কোটি মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ, জাপানি বেসরকারি বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন হুমায়ুন কবির।
তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এ সম্ভাবনাকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছেন। প্রস্তাবিত বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে দেশে প্রায় দুই লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে তিনি পরিষ্কার করেন, এটি জাপান সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ঋণ প্রদানের ঘোষণা নয়; বরং বাংলাদেশে জাপানের বেসরকারি খাতের সম্ভাব্য বিনিয়োগের বিষয়।
এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্র চিহ্নিত করতে শিগগিরই জাপানের একটি অর্থনৈতিক প্রতিনিধিদলের বাংলাদেশ সফরের প্রত্যাশা করছে সরকার।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, যেকোনো বিনিয়োগ প্রস্তাব গ্রহণের ক্ষেত্রে দেশের জাতীয় অগ্রাধিকার, আর্থিক সক্ষমতা, অর্থনৈতিক সুফল এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া হবে।
বিআইজি-বি উদ্যোগে নতুন লক্ষ্য
বাংলাদেশ ও জাপান দীর্ঘদিনের ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’ বা বিআইজি-বি কর্মসূচিকে নতুনভাবে এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছে। এর নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘বিআইজি-বি ফর শেয়ার্ড প্রসপারিটি’ বা অভিন্ন সমৃদ্ধির জন্য বিআইজি-বি।
এই কর্মসূচির আওতায় জ্বালানি, গভীর সমুদ্রবন্দর, শিল্প অবকাঠামো, তথ্যপ্রযুক্তি এবং যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
হুমায়ুন কবির জানান, সফরকালে এ বিষয়ে আলোচনা মূলত বাংলাদেশ ও জাপানের দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
বড় উন্নয়ন প্রকল্পে সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে জাপান
বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দিয়েছে জাপান।
আলোচনায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালুর প্রস্তুতি, ঢাকার গণপরিবহন ও মেট্রোরেল প্রকল্পের অগ্রগতি এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের নির্মাণ ও পরিচালনা নিয়ে সহযোগিতার বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে।
এ ছাড়া জাপানের কাছ থেকে ৫ হাজার কোটি ইয়েন বা প্রায় ৩১ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলারের জরুরি সহায়তা ঋণ পাওয়ার বিষয়েও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জ্বালানি সরবরাহের ধারাবাহিকতা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় এ সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জাইকার প্রেসিডেন্ট ড. আকিহিকো তানাকার সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করার ওপর গুরুত্ব দেন। পাশাপাশি সহজ শর্তে অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা বাড়ানোর আহ্বান জানান।
প্রযুক্তি ও দক্ষ জনশক্তি উন্নয়নে নতুন উদ্যোগ
জাপানের শীর্ষস্থানীয় শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে বাংলাদেশে বিনিয়োগ সম্প্রসারণের বিভিন্ন ক্ষেত্র নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছিল ফাস্ট রিটেইলিং, মারুবেনি করপোরেশন, মিতসুবিশি করপোরেশন এবং টয়োটা সুশো করপোরেশন।
বৈঠকে তৈরি পোশাক, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি, আধুনিক উৎপাদনশিল্প ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তর, কারিগরি প্রশিক্ষণ, দক্ষতা বৃদ্ধি, পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন এবং রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ নিয়ে মতবিনিময় হয়।
জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ফোরামের আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী জাপানি উদ্যোক্তাদের বাংলাদেশের বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর আহ্বান জানান।
জ্বালানি ও গাড়ি উৎপাদনে আগ্রহ
জাপান সফরের সময় প্রধানমন্ত্রী ফুৎসু শহরে জেরা (জেইআরএ)-এর এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শন করেন। পাশাপাশি চিবা অঞ্চলের একটি লজিস্টিকস কেন্দ্রও ঘুরে দেখেন।
এসব পরিদর্শনের মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়নে অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত ধারণা অর্জন করা।
এ ছাড়া নাগোয়া শহরে টয়োটার উৎপাদন কারখানা পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা বাংলাদেশে গাড়ি ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি উৎপাদনের কারখানা স্থাপনের বিষয়ে তাদের আগ্রহের কথা জানান।
ছয়টি সহযোগিতা দলিল স্বাক্ষর
প্রতিমন্ত্রী জানান, প্রধানমন্ত্রীর সফরে অর্থনৈতিক সম্পর্ক, ব্যবসায়িক পরিবেশ, কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, উপকূলীয় নিরাপত্তা, জলবায়ু এবং তথ্যপ্রযুক্তিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ছয়টি সহযোগিতা চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।
এ ছাড়া বিনিয়োগ সহায়তা এবং স্থানীয় সরকার উন্নয়নসংক্রান্ত বিভিন্ন ব্যবস্থাও চূড়ান্ত করা হয়েছে।
দুই দেশ নগর উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা, দুর্যোগ মোকাবিলা, পরিবেশ সংরক্ষণ, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে একযোগে কাজ করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।
রোহিঙ্গা সংকটসহ আন্তর্জাতিক বিষয়ে আলোচনা
সফরে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের সংকটের স্থায়ী সমাধানে জাপানের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বিষয়েও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা, সমুদ্র ও আকাশপথে অবাধ চলাচল, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার এবং পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে মতবিনিময় করেন।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের মতে, প্রধানমন্ত্রীর এই সফর বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ককে নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এগিয়ে নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। ভবিষ্যতে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সহযোগিতা আরও বিস্তৃত হবে বলে আশা করছে সরকার।

