মব ভায়োলেন্স: সামাজিক ব্যাধি, গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত
অথব
মব ভায়োলেন্স: রাষ্ট্র, সমাজ ও গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে এক ভয়াবহ নীরব যুদ্ধ
সম্পাদকীয় বিশ্লেষণ প্রতিবেদনঃ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় “মব ভায়োলেন্স” বা উচ্ছৃঙ্খল জনতার সহিংসতা এখন কেবল বিচ্ছিন্ন আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি ধীরে ধীরে এক ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিচ্ছে। গণপিটুনি, দলবদ্ধ হামলা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, ব্যক্তিগত আক্রোশ এবং গুজবকে কেন্দ্র করে সংঘটিত সহিংসতা দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো, নাগরিক অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় সুশাসনের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, মানবাধিকারকর্মী ও সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, যখন কোনো সমাজে বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা কমে যায়, রাজনৈতিক বিভাজন চরমে পৌঁছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ন্ত্রণহীনভাবে গুজব ছড়ানোর হাতিয়ার হয়ে ওঠে এবং দলীয় পরিচয় মানবিক পরিচয়কে গ্রাস করে—তখন “মব” বা উচ্ছৃঙ্খল জনতার সংস্কৃতি জন্ম নেয়। বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের পর এই প্রবণতা নতুন মাত্রা পেয়েছে বলে বিভিন্ন মহল থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে।
গত কয়েক মাসের পরিসংখ্যান পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে স্পষ্ট করে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে অন্তত ১৪১টি মব ভায়োলেন্স বা গণপিটুনির ঘটনায় ৮৩ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। কেবল চলতি বছরের এপ্রিল মাসেই সারাদেশে ৪৯টি গণপিটুনি বা মব সহিংসতার ঘটনায় প্রাণ গেছে অন্তত ২১ জনের। মার্চে ৩৬টি ঘটনায় নিহত হন ১৯ জন, ফেব্রুয়ারিতে ১৮ জন, জানুয়ারিতে ২১ জন এবং তার আগের ডিসেম্বরে নিহত হন ১০ জন। এই ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে, সমস্যা সাময়িক নয়; বরং এটি ক্রমাগত বিস্তৃত হচ্ছে।
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন সংস্থার পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব সহিংসতা পরিকল্পিত বা প্ররোচনামূলক। ব্যক্তিগত শত্রুতা, জমিজমা বিরোধ, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা, চাঁদাবাজি কিংবা সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—বিশেষ করে ফেসবুকে—একজন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পোস্ট, ছবি বা অপতথ্য ছড়ানো হয়। এরপর তাকে “স্বৈরাচারের দোসর”, “দুর্নীতিবাজ”, “রাষ্ট্রবিরোধী”, “ধর্মবিরোধী” কিংবা “অপরাধী” আখ্যা দিয়ে জনরোষ তৈরি করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই ছাড়াই উত্তেজিত জনতা হামলে পড়ে, মারধর, লাঞ্ছনা, ভাঙচুর এমনকি হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত ঘটায়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো—এ ধরনের সহিংসতা কেবল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; শিক্ষক, সাংবাদিক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা-কর্মচারী, ব্যবসায়ী, সাধারণ নাগরিক, এমনকি নিরীহ পথচারীরাও এর শিকার হচ্ছেন। সমাজে ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার, রাজনৈতিক মতাদর্শ পরিবর্তনের স্বাধীনতা কিংবা অতীতে কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার কারণেও অনেকে এখন টার্গেট হচ্ছেন। অথচ একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক মত প্রকাশ, দল পরিবর্তন বা মতাদর্শিক অবস্থান নেওয়া নাগরিক অধিকার।
বাংলাদেশের ইতিহাসে দেখা গেছে, স্বাধীনতার পর বহু রাজনৈতিক নেতা আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াতসহ বিভিন্ন দলে সময় ও আদর্শ অনুযায়ী যোগ দিয়েছেন বা দল পরিবর্তন করেছেন। গণতন্ত্রের মূল শক্তিই হলো রাজনৈতিক বহুত্ববাদ। কিন্তু যদি কোনো ব্যক্তি অতীতের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণে বর্তমান সময়ে মবের শিকার হন, তাহলে তা শুধু ব্যক্তি অধিকার লঙ্ঘন নয়—রাষ্ট্রীয় গণতান্ত্রিক চেতনার ওপরও আঘাত।
অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, বিগত সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও সামাজিক বিভিন্ন স্তরে বাধ্যতামূলক আনুগত্যের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল। সেই বাস্তবতায় বহু মানুষ পরিস্থিতির শিকার হয়ে ক্ষমতাসীন কাঠামোর সঙ্গে থেকেছেন। এখন তাদের সবাইকে এক কাতারে “অপরাধী” হিসেবে চিহ্নিত করে সামাজিক প্রতিশোধের লক্ষ্য বানানো ন্যায়বিচারের পথ নয়; বরং এটি প্রতিহিংসার রাজনীতি।
বর্তমানে রাজনৈতিক অঙ্গনে মব ইস্যুতে ভিন্ন ভিন্ন ন্যারেটিভ দেখা যাচ্ছে। কোনো কোনো পক্ষ এসব ঘটনাকে “জনরোষ” বলে ব্যাখ্যা করছে—তাদের মতে, দীর্ঘদিনের নির্যাতন, দমন-পীড়ন ও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে কিছু ঘটনা ঘটছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—জনরোষ কি আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার বৈধতা দেয়? গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রতিশোধের জায়গা আদালত নয়, রাজপথও নয়; বরং বিচারব্যবস্থা। বিচারহীনতা যেমন অন্যায়, তেমনি বিচারবহির্ভূত গণপিটুনিও সভ্যতার পরিপন্থী।
অপরাধ বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, “জনরোষ” শব্দটি যদি সহিংসতার বৈধতা পায়, তাহলে সমাজে আইনের শাসনের জায়গা দখল করবে গোষ্ঠীগত শক্তি। এর ফলে প্রতিপক্ষ দমন, সম্পদ দখল, চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক আধিপত্য ও ব্যক্তিগত প্রতিশোধের নতুন পথ খুলে যাবে।
মব ভায়োলেন্সের আরেকটি বিপজ্জনক মাত্রা হলো—সোশ্যাল মিডিয়াকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার। ফেসবুক লাইভ, ভুয়া স্ক্রিনশট, পুরনো ছবি, বিকৃত ভিডিও, গুজবনির্ভর পোস্ট—এসবের মাধ্যমে কয়েক মিনিটেই জনমনে উত্তেজনা তৈরি করা হচ্ছে। ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাব, তথ্য যাচাইয়ের অনীহা এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ এই সমস্যাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে একটি পোস্টই জীবন-মৃত্যুর ব্যবধান তৈরি করছে।
শুধু মব সহিংসতাই নয়, সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। বিভিন্ন মানবাধিকার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে—এপ্রিল মাসে অন্তত ৩১২টি সহিংস ঘটনার মধ্যে ৫৪টি ধর্ষণ, ১৪টি সংঘবদ্ধ ধর্ষণ এবং ৮৯ নারী ও শিশু হত্যার শিকার হয়েছেন। মার্চে নারী ও শিশু হত্যার সংখ্যা ছিল ৭৩। অর্থাৎ সামগ্রিক সহিংসতা, সামাজিক অস্থিরতা এবং আইনশৃঙ্খলার চ্যালেঞ্জ একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।
রাজনৈতিক সহিংসতার পরিসংখ্যানও ভয়াবহ। গত ১৭ মাসে দেশে ১ হাজার ৪১১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ৪৫৪ জন। এসব ঘটনার বড় অংশই দলীয় কোন্দল, আধিপত্য বিস্তার, প্রতিশোধমূলক হামলা ও মব সৃষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত।
নবনির্বাচিত সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী “মব কালচারের দিন শেষ” ঘোষণা দিলেও বাস্তবতা বলছে—এটি কেবল প্রশাসনিক ঘোষণা দিয়ে থামানো যাবে না। প্রয়োজন বহুমাত্রিক রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক উদ্যোগ।
প্রথমত, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিরপেক্ষভাবে দ্রুত হস্তক্ষেপ করতে হবে। কোনো ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক পরিচয় নয়, অপরাধের প্রকৃতি বিবেচনায় ব্যবস্থা নিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও প্ররোচনামূলক কনটেন্ট শনাক্তে কার্যকর মনিটরিং, ডিজিটাল শিক্ষা ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
তৃতীয়ত, বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। অপরাধী যে দল বা মতেরই হোক, শাস্তি নিশ্চিত না হলে জনগণের একাংশ আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা থেকে সরে আসবে না।
চতুর্থত, রাজনৈতিক দলগুলোকে স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে—“জনরোষ” নামে সহিংসতার বৈধতা দেওয়া যাবে না।
পঞ্চমত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকে সহনশীলতা, মতভিন্নতার প্রতি শ্রদ্ধা এবং আইনের শাসনের পক্ষে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
গণতন্ত্র কেবল নির্বাচন নয়; গণতন্ত্র মানে ভিন্নমতের নিরাপত্তা, আইনের সমতা, মানবিক মর্যাদা এবং বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা। যদি কোনো সমাজে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট, রাজনৈতিক তকমা বা গোষ্ঠীগত উসকানি একজন নাগরিকের জীবন কেড়ে নিতে পারে—তাহলে সেখানে গণতন্ত্রের ভিত দুর্বল হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। প্রতিহিংসা, গুজব, দলবদ্ধ সহিংসতা ও রাজনৈতিক মব সংস্কৃতি যদি এখনই নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে তা কেবল সরকারের সুনামহানি নয়—রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ, সামাজিক স্থিতি এবং আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকেও গভীর সংকটে ফেলবে।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব আইনের শাসন নিশ্চিত করা, রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব সহিংসতা নিরুৎসাহিত করা, গণমাধ্যমের দায়িত্ব সত্য যাচাই করা এবং নাগরিকের দায়িত্ব গুজব প্রতিরোধ করা। অন্যথায় “মব” নামক এই সামাজিক ব্যাধি একসময় রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে—আইন, ন্যায়বিচার ও গণতন্ত্র কি জনতার উন্মত্ততার ওপর বিজয়ী হতে পারে কিনা। এখনই সময়, রাষ্ট্র ও সমাজকে একসঙ্গে বলতে হবে—বিচার আদালতে হবে, রাজপথে নয়।
মব ভায়োলেন্স: রাষ্ট্র, সমাজ ও গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে এক ভয়াবহ নীরব যুদ্ধ
সম্পাদকীয় বিশ্লেষণ : বাংলাদেশ আজ এমন এক উদ্বেগজনক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে “মব ভায়োলেন্স” বা উচ্ছৃঙ্খল জনতার সহিংসতা কেবল আইনশৃঙ্খলার বিচ্ছিন্ন অবনতি নয়—এটি ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা, নাগরিক নিরাপত্তা, সামাজিক সহনশীলতা এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে এক ভয়াবহ নীরব যুদ্ধে পরিণত হচ্ছে। যখন কোনো দেশে আদালতের আগে জনতা রায় দেয়, প্রমাণের আগে গুজব শাস্তি নির্ধারণ করে, আর আইনের শাসনের জায়গা দখল করে উন্মত্ত প্রতিশোধ—তখন সেই সমাজ সভ্যতার পথ থেকে সরে গিয়ে ভয়ংকর অরাজকতার দিকে ধাবিত হয়।
বর্তমান বাংলাদেশে মব ভায়োলেন্স এখন আর কেবল গণপিটুনি নয়; এটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমনির্ভর অপপ্রচার, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, ব্যক্তিগত আক্রোশ, চাঁদাবাজি, ক্ষমতার দখলদারিত্ব এবং সামাজিক বিভাজনের এক বহুমাত্রিক অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। ফেসবুক পোস্ট, বিকৃত ছবি, পুরনো ভিডিও, গুজব, মিথ্যা অভিযোগ কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত রাজনৈতিক তকমা—এসবকে ব্যবহার করে একজন মানুষকে মুহূর্তেই “দোষী” বানিয়ে জনতার হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। ভয়াবহ বাস্তবতা হলো—অনেক ক্ষেত্রেই পরবর্তী ধাপ হচ্ছে গণপিটুনি, লাঞ্ছনা, সম্পদ ধ্বংস, এমনকি হত্যাকাণ্ড।
মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ বলছে, গত কয়েক মাসে দেশে অন্তত ১৪১টি মব সহিংসতার ঘটনায় ৮৩ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। শুধু চলতি বছরের এপ্রিলেই ৪৯টি গণপিটুনির ঘটনায় প্রাণ গেছে অন্তত ২১ জনের। মার্চে ৩৬টি ঘটনায় নিহত ১৯, ফেব্রুয়ারিতে ১৮, জানুয়ারিতে ২১ এবং তার আগের ডিসেম্বরে ১০ জন নিহত হয়েছেন। এই সংখ্যা কেবল পরিসংখ্যান নয়—প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার ধ্বংসের গল্প, একটি সন্তানের পিতৃহারা হওয়ার ইতিহাস, একটি মায়ের বুকফাটা কান্না, একটি রাষ্ট্রের ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।
সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো—এসব সহিংসতার বড় অংশের পেছনে প্রকৃত অপরাধ নয়, বরং “তকমা” কাজ করছে। কাউকে “স্বৈরাচারের দোসর”, “পূর্ববর্তী সরকারের লোক”, “দুর্নীতিবাজ”, “ধর্মবিরোধী”, “রাষ্ট্রবিরোধী” কিংবা “অমুক দলের সমর্থক” হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চিহ্নিত করেই উন্মত্ত জনতাকে উসকে দেওয়া হচ্ছে। তদন্তে বহু ক্ষেত্রেই উঠে এসেছে—ব্যক্তিগত শত্রুতা, জমি দখল, ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা, রাজনৈতিক আধিপত্য কিংবা প্রতিশোধস্পৃহাই এসব ঘটনার প্রকৃত চালিকাশক্তি। অর্থাৎ “ন্যায়বিচার” নয়, বরং “গণআদালতের” নামে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের সংস্কৃতি গড়ে উঠছে।
এটি কেবল ব্যক্তি নিরাপত্তার জন্য নয়—রাষ্ট্রের জন্যও গভীর হুমকি। কারণ যখন সাধারণ মানুষ দেখবে, আইন তাকে রক্ষা করতে পারছে না; বরং ফেসবুক পোস্ট বা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে যেকোনো সময় সে জনরোষের শিকার হতে পারে—তখন রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা ভেঙে পড়ে। আর যখন রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা কমে যায়, তখন গণতন্ত্র দুর্বল হয়, প্রতিষ্ঠান ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, উগ্রতা শক্তিশালী হয়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বহুদলীয় রূপান্তর, মতাদর্শিক পরিবর্তন এবং ক্ষমতার পালাবদলের সাক্ষী। স্বাধীনতার পর অসংখ্য রাজনীতিক আওয়ামী লীগ থেকে বিএনপি, বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি থেকে অন্য দলে কিংবা বিভিন্ন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে স্থানান্তরিত হয়েছেন। এটিই গণতন্ত্রের বাস্তবতা—রাজনীতি কোনো কারাগার নয়। কিন্তু আজ যদি অতীতের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা বা বাধ্যতামূলক অবস্থানের কারণে শিক্ষক, সাংবাদিক, সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী কিংবা সাধারণ নাগরিকদের “শত্রু” বানানো হয়, তাহলে তা গণতন্ত্র নয়—এটি ভয়ভীতিনির্ভর প্রতিশোধ রাষ্ট্রের লক্ষণ।
বিশেষভাবে উদ্বেগজনক যে, বিগত দীর্ঘ রাজনৈতিক বাস্তবতায় বহু মানুষ ইচ্ছার বিরুদ্ধে ক্ষমতাসীন বলয়ের সঙ্গে থাকতে বাধ্য হয়েছেন—প্রশাসনিক নিরাপত্তা, চাকরি, শিক্ষা, সামাজিক টিকে থাকা কিংবা নিপীড়ন এড়াতে। এখন সেই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে সবাইকে একই কাঠগড়ায় দাঁড় করানো শুধু অন্যায় নয়, বরং জাতীয় পুনর্মিলনের পথও রুদ্ধ করে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে মব ইস্যুতে বিপজ্জনক দ্বৈততা দেখা যাচ্ছে। একদল এটিকে “জনরোষ” হিসেবে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী—“জনরোষ” নামের আবেগকে যখন আইনের ঊর্ধ্বে তোলা হয়, তখন তা খুব দ্রুত সভ্য সমাজকে বর্বরতার দিকে ঠেলে দেয়। ফরাসি বিপ্লব থেকে শুরু করে উপমহাদেশের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা—সবখানেই দেখা গেছে, জনতার আবেগ যখন বিচারক হয়, তখন নিরপরাধের রক্ত সবচেয়ে বেশি ঝরে।
আজ বাংলাদেশে “মব” যদি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের হাতিয়ার হয়, কাল সেটি দলীয় কোন্দল, গোষ্ঠীগত প্রতিশোধ, ধর্মীয় উসকানি কিংবা অর্থনৈতিক স্বার্থে আরও ভয়াবহ রূপ নেবে। অর্থাৎ যে আগুন আজ প্রতিপক্ষের ঘরে, কাল তা রাষ্ট্রের প্রতিটি দরজায় পৌঁছাতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখানে সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হয়ে উঠেছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম আজ তথ্যের পাশাপাশি বিভ্রান্তি, বিদ্বেষ ও গণউন্মাদনা তৈরির কারখানায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে। একটি এডিট করা ছবি, একটি ভুয়া স্ট্যাটাস, একটি পুরনো ভিডিও—মুহূর্তেই হাজারো মানুষের বিচারবোধ কেড়ে নিচ্ছে। ফলে “শেয়ার” বাটন এখন কখনও কখনও অস্ত্রের ট্রিগারের মতো বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।
এদিকে সামগ্রিক সহিংসতার চিত্রও উদ্বেগজনক। এপ্রিল মাসে ৩১২টি সহিংস ঘটনা, ৫৪টি ধর্ষণ, ১৪টি সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, ৮৯ নারী ও শিশু হত্যাকাণ্ড—এসব শুধু অপরাধের সংখ্যা নয়; এগুলো রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক মূল্যবোধ এবং বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থার সূচক। রাজনৈতিক সহিংসতা, সামাজিক অপরাধ এবং মব কালচার—সব মিলিয়ে এটি একটি বৃহত্তর নিরাপত্তা সংকটের বহিঃপ্রকাশ।
নবনির্বাচিত সরকারের পক্ষ থেকে “মব কালচারের দিন শেষ” ঘোষণা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা। কিন্তু বাস্তবতা হলো—ঘোষণা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দৃশ্যমান, নিরপেক্ষ এবং কঠোর প্রয়োগ। জনগণ দেখতে চায়—অপরাধী যদি ক্ষমতাসীন দলেরও হয়, তবুও কি তার বিচার হবে? কারণ বিচার যদি বাছাই করা হয়, তবে মব আরও শক্তিশালী হবে।
রাষ্ট্রকে এখন কয়েকটি মৌলিক পদক্ষেপ নিতে হবে—
প্রথমত, মব ভায়োলেন্সকে বিশেষ অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের আওতায় আনতে হবে।
দ্বিতীয়ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক গুজব, অপপ্রচার ও সহিংস উসকানিদাতাদের বিরুদ্ধে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও কঠোর আইন প্রয়োগ জরুরি।
তৃতীয়ত, পুলিশ ও প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে তাৎক্ষণিক প্রতিরোধ সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
চতুর্থত, রাজনৈতিক দলগুলোকে স্পষ্টভাবে ঘোষণা দিতে হবে—“জনরোষ” কখনও আইন নয়।
পঞ্চমত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পরিবার, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃত্বকে সহনশীলতা, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের সংস্কৃতি পুনর্গঠনে ভূমিকা নিতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা—রাষ্ট্রকে প্রমাণ করতে হবে, প্রতিশোধ নয়; ন্যায়বিচারই শেষ কথা। কারণ গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করা নয়, বরং ভিন্নমতকেও নিরাপত্তা দেওয়া।
বাংলাদেশ যদি এখনই মব ভায়োলেন্সকে রাজনৈতিক সুবিধা, সামাজিক প্রতিশোধ বা সাময়িক আবেগের বিষয় হিসেবে দেখে, তাহলে ভবিষ্যতে এর মূল্য হতে পারে ভয়াবহ। এতে সরকারের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হবে, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি দুর্বল হবে, বিনিয়োগ ও উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে, আর সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে—নাগরিকরা রাষ্ট্রের ওপর বিশ্বাস হারাবে।
মনে রাখতে হবে, একটি সভ্য রাষ্ট্রে বিচার আদালতে হয়, ফেসবুক পোস্টে নয়; অপরাধ প্রমাণ হয় আইনে, জনতার চিৎকারে নয়; গণতন্ত্র টিকে থাকে মতের ভিন্নতায়, প্রতিহিংসায় নয়।
আজ বাংলাদেশের সামনে প্রশ্ন একটাই—আমরা কি আইনের শাসনের রাষ্ট্র গড়বো, নাকি গুজব, প্রতিশোধ ও মবের হাতে ভবিষ্যৎ তুলে দেবো?
সময় এখনই। কারণ মব ভায়োলেন্স শুধু কয়েকজন মানুষের প্রাণ নিচ্ছে না—এটি ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি, গণতন্ত্রের আত্মা এবং সভ্যতার মুখচ্ছবি হত্যা করছে।
লেখক ও গবেষকঃ
আওরঙ্গজেব কামাল
সভাপতি
ঢাকা প্রেস ক্লাব ও
আন্তর্জাতিক প্রেস ক্লাব

