বিএনপির আগামী দিনের নীতি জনগণের জীবনমান উন্নয়নের রাজনীতি। দেশে বিদেশে ব্যাপকহারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার রাজনীতি বলেছেন,বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থান, শোক ও বিজয়ের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আজ সোমবার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদল আয়োজিত “ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন ও আমার না বলা কথা” শীর্ষক আলোচনা সভা এবং শহীদ পরিবারকে সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ (আইইবি) প্রাঙ্গণে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি বক্তব্যে তারেক রহমান আরও বলেন, পরিষ্কারভাবে একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমি যেমন বুঝি, পরিষ্কারভাবে এখানে প্রত্যেকটি মানুষ অনুধাবন করেন বাংলাদেশের জনগণ পরিবর্তন চায় এখন। আর স্বপ্ন কিংবা প্রতিশ্রুতি নয়, জনগণ এবার প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন চায়। এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি জনগণের সেই আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে আগামী দিনের রাজনৈতিক কর্মসূচি প্রণয়ন করছে। তিনি বলেন, চেষ্টা করছি আমরা আমাদের নেতাকর্মী আমাদের দলের ভেতরে, দলের বাইরে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ যারা আছেন তাদের সাথে বিভিন্ন বিষয়ে আমরা আলোচনা করছি, কাজ করছি। আমাদের আগামী দিনের নীতি জনগণের জীবন উন্নয়নের রাজনীতি। দেশে বিদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা, এটাই হবে আমাদের রাজনীতির অন্যতম মূল লক্ষ্য। তিনি বলেন, জনগণ এবার প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন চায়। তিনি বলেন, আমি বিশ্বাস করি, এ মুহূর্তে বাংলাদেশের মানুষ কথামালার রাজনীতি আর চাচ্ছে না। তারা একটি পরিবর্তন চাচ্ছে। প্রতিশ্রুতি চাচ্ছে না বরং প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন চাচ্ছে। জনগণ এখন সুস্থ পরিকল্পনা গ্রহণ এবং প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন চায়। সেই প্রত্যাশা পূরণের লক্ষ্যে, জনগণের জীবন মান উন্নয়নে সুনির্দিষ্টভাবে কতগুলো পরিকল্পনা গ্রহণ করছে বিএনপি। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ৫৪ বছর পার করেছে। বিগত ১৭ বছর এই দেশের মানুষ তাদের রাজনৈতিক অধিকার, কথা বলার অধিকারের জন্য আন্দোলন করেছে। সংগ্রাম করেছে, অত্যাচার, নির্যাতন সহ্য করেছে, গুম খুনের শিকার হয়েছে। শুধু জুলাই-আগস্ট না, বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মী, সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অধিকারের কথা তুলে ধরতে গিয়ে পলাতক স্বৈরাচারের অত্যাচার নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তাদের প্রত্যেকের সেই ত্যাগের প্রতি যদি সম্মান জানাতে হয় তাহলে অবশ্যই আমাদের সামনে বাড়তে হবে। সামনে এগোতে হবে। তারেক রহমান বলেন, দেশের মোট জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশের বেশি যুবসংখ্যা। যুবসংখ্যার সবাই বেকার নয়। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো যুবসমাজের বেকারদের বেশিরভাগ হলো শিক্ষিত বেকার। এর পেছনে নানা কারণের মধ্যে আমাদের বিদ্যমান শিক্ষা কারিকুলাম অন্যতম একটি কারণ। তবে অবশ্যই সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষা কারিকুলাম সংস্কার না করার জন্য রাজনীতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে যারা জড়িত, আমরা মনে করি আমরা কেউ বোধ হয় এর দায় এড়াতে পারি না। এমন বাস্তবতায় কর্মমুখী শিক্ষা কারিকলাম প্রণয় এবং বাস্তবায়নের জন্য বিএনপির উদ্যোগে একটি বিশেষজ্ঞ টিম কাজ করছেন। যার ভেতরে আমাদের দলের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত আছেন এরকম সদস্য আছেন। আবার দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন, কিন্তু এ বিষয়ে যাদের অভিজ্ঞতা আছে, এক্সপার্টিজ আছে, এ রকম মানুষ সেই টিমের মধ্যে কাজ করছেন। শিক্ষা কারিকুলামের স্কুল পর্যায় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত একাডেমিক স্টাডির পাশাপাশি ব্যবহারিক এবং কারিগারি শিক্ষা কীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা যায়, সে ব্যাপারে মোটামুটিভাবে উনারা কাজে এগিয়ে গিয়েছেন এবং এটি আমাদের পরিকল্পনা। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ। স্বৈরাচারের আমলে দেখেছি বহু টাকা খরচ করে কিছু কিছু প্রজেক্ট তারা তৈরি করেছে। কিন্তু আমাদের দরকার দেশের যুবসমাজকে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। কাজেই বহু বড় একটি প্রকল্প করার চাইতে, আমরা মনে করি-যদি ছোট ছোট উদ্যোগতা, এন্টারপ্রেনার তৈরি করা দরকার। যারা ছোট কুটির শিল্প তৈরি করবেন, মাঝারি শিল্প তৈরি করবেন তারা আবার বহু মানুষকে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেবেন। তাহলে দেশের যুবসমাজসহ সমাজের বিভিন্ন মানুষের কর্মসংস্থান আমরা করতে পারব। সেজন্যই আমরা এ পরিকল্পনাগুলো গ্রহণ করছি। এর পাশাপাশি কর্মক্ষম জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তর করার লক্ষ্যে ব্যাপক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারি। প্লামিং ইলেকট্রিশিয়ান মেকানিক ডেন্টাল হাইজিনিস্ট অথবা মেডিকেল টেকনিশিয়ানের মতন এ ধরনের এর ছাড়াও স্বল্প মেয়াদি ট্রেডিং কোর্স এগুলো কীভাবে চালু করা যায় সেই পরিকল্পনা গ্রহণ করছি। একইভাবে আমরা দক্ষ বা স্কিল লেবার বিদেশে আমরা পাঠাতে পারব। যেটা ভ্যালু যোগ করবে। আরও অধিক সংখ্যক বৈদেশিক মুদ্রা তারা আমাদেরকে পাঠাতে সক্ষম হবে। তারেক রহমান বলেন, বিশ্বায়নের বর্তমান সময়ে দক্ষ মানুষের জন্য অনেক দেশি সম্ভাবনার সকল দরজা খোলা। তবে এ সুযোগকে যদি আমাদের দেশের সন্তানদের কাজে লাগাতে হয়, তাহলে ভাষা জানা থাকাটা খুব জরুরি । এ কারণেই স্কুলে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি আগ্রহী তরুণ, যারা স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে এসেছেন বা ইন্টারমিডিয়েটের গন্ডি বা ডিগ্রির গন্ডি পেরিয়ে এসেছেন, এ রকম বহু তরুণ আছেন যাদের কর্মসংস্থানের প্রয়োজন। এ মানুষগুলোকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ভাষায় শেখানোর জন্য আমরা ভাষা শিক্ষা কোর্স চালু করব। যেটি শুধু ঢাকা শহরে সীমাবদ্ধ থাকবে না, এটিকে আমরা জেলা পর্যায় পর্যন্ত ছড়িয়ে দিতে। ল্যাঙ্গুয়েজ সেন্টারের স্বল্পমেয়াদী ভাষা শিক্ষা কোর্স শেখানোর জন্য দেশে এবং বিদেশ থেকেও শিক্ষক নিয়োগ দেব।তিনি বলেন, নাগরিকদের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করার জন্য বিএনপি একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। নাগরিকদের প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করার জন্য আমরা একটি নীতিতে বিশ্বাস করি। যেটি উন্নত বিশ্বেও এখন তারা এটি প্রয়োগ করছে। সেটি হচ্ছে প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম। অর্থাৎ একজন মানুষ অসুস্থ হয়ে গেলে কিন্তু তার পেছনে খরচ অনেক বেশি। এজন্য কিছু ইনফরমেশনের মাধ্যমে যদি একজন মানুষও সুস্থ থাকতে পারেন, তাহলে চাপ কমবে। প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম এই নীতিমালার ওপরে ভিত্তি করে আমরা আমাদের স্বাস্থ্য বিষয় সংক্রান্ত পুরা প্ল্যানিংটাকে আমরা সাজাতে চাচ্ছি। সমগ্র বাংলাদেশে ইউনিয়ন পর্যায়ে এবং গ্রাম পর্যায়ে যাওয়ার জন্য হেলথ কেয়ারের ওয়ার্কার নিয়োগের পরিকল্পনা করেছি।বিএনপি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে হলে পরিবেশ এবং জলবায়ুর পরিবর্তন একটি গুরুত্বপূর্ণ। এটিকে এড়িয়ে যাবার কোনোই সুযোগ নেই। বাংলাদেশের সরকারি-বেসরকারি সব মিলিয়ে প্রায় ১ লাখ নার্সারি রয়েছে। পাঁচ বছরে আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে ২৫ থেকে ৩০ কোটি গাছ লাগানোর। যে গাছ; আমরা মনে করি পরিবেশকে যেমন রক্ষা করবে একইভাবে বাংলাদেশকে বন্যা খরা থেকেও রক্ষা করবে। আগামী দিনে সরকার গঠন করতে সক্ষম হলে আমরা যেকোনো মূল্যে সমগ্র দেশে খাল খনন কর্মসূচি আবার শুরু করব।তিনি বলেন, আমরা মনে করি, জনগণই বিএনপির সব রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস। জনগণের রায় বিএনপির রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে আমরা যত দ্রুততার সঙ্গে সম্ভব এই পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের কাজ শুরু করব।যুবদলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, বিগত দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী বিরোধী আন্দোলনে যুবদলের নেতাকর্মীরা নির্যাতন নিপীড়ন উপেক্ষা করেও রাজপথে আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। আন্দোলন করতে গিয়ে ফ্যাসিবাদী সরকারের পতিত পলাতক ফ্যাসিবাদী সরকারের শত নির্যাতনেও নিপীড়নেও যুবদল পিছিয়ে যায়নি। রাজপথ ছেড়ে যায়নি তারা। শুধুমাত্র জুলাই আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে যুবদলের ৭৮ জন নেতাকর্মী শহীদ হয়েছেন। জনগণ আপনাদের সঙ্গে ছিল। আপনাদের প্রতি জনগণের বিশ্বাস ছিল। এ কারণেই আপনারা সাহসের সঙ্গে প্রতিবাদ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পেরেছেন। সুতরাং আপনাদের প্রতি জনগণের সেই আস্থা ও বিশ্বাস ধরে রাখুন। মনে রাখবেন জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারলে আপনি নেতা। জনগণ প্রত্যাখ্যান করলে আপনি নেতা নন। প্রশাসনিক সহায়তায় নেতৃত্ব হয়তো প্রদর্শন করা যায়। কিন্তু জনগণ সহায়তা করলে নেতৃত্ব দেওয়া যায়।বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, দেশ নিয়ে একটা ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত চলছে। একটা অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা চলছে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে দেওয়া হয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, একটা ধ্বংসের পথ পার করেছি। ধ্বংসপ্রাপ্ত রাজনীতিকে মেরামত করে সামনে এগোতে হবে। বিএনপিকেই সেই দায়িত্ব নিতে হবে। সেই চ্যালেঞ্জ নিতে হবে।বাংলাদেশ কখনো মাথা নত করেনি, লড়াই করে গেছে, সংগ্রাম করে গেছে উল্লেখ করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, আমরা লড়াই করেছি, রক্ত দিয়েছি। জিয়াউর রহমান আমাদের একটি নতুন দেশ দিয়েছিলেন। একদলীয় শাসন থেকে গণতান্ত্রিক দেশ করেছিলেন।‘অর্থনীতিতে নতুন যাত্রা করেছিল দেশ। গণতন্ত্রের যতগুলো কাঠামো আছে তার সবকিছু জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়া করেছেন। আমরা আবার সুযোগ পেয়েছি বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার’-যোগ করেন মির্জা ফখরুল।বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ভাবনাকে ‘ড্রিম’ বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সুযোগকে নষ্ট করে দিতে ষড়যন্ত্র চলছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস।তিনি বলেন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য এখন সুবর্ণ সুযোগ। কিন্তু এ সুযোগ নষ্ট করার জন্য সরকারের ভেতরে-বাইরে নানা ষড়যন্ত্র চলছে। কয়েকটা বাচ্চা ছেলের মুখের কথায় মনে হচ্ছে, তারা যা বলবে আমরা তাই করব। এরা মানুষকে মানুষ মনে করে না।সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন বিএনপি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন, মানবাধিকার কর্মী সাইয়েদ আবদুল্লাহ, যুবদলের রবিউল ইসলাম নয়ন, দীর্ঘদিন গুম হয়ে থাকা অ্যাডভোকেট সোহেল রানা, জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের হাসপাতালে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক সায়েম আল মনসুর ফয়েজী, শহীদ মোসলেহ উদ্দিনের ছেলে আপন, ইয়াহিয়া আলীর মেয়ে তাইয়েবা খাতুন, হাফিজুর রহমান সুমনের স্ত্রী বিধী আখতার, নাদিম মিজানের স্ত্রী তাবাসসুম আখতার নেহা।এ সময় উপস্থিত ছিলেন- বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলু, চেয়ারপারসনের উপদেষ্ট অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, বিএনপির প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, বিএনপি নেতা সাইফুল আলম নিরব, যুবদলের সহসভাপতি রেজাউল করিম পল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বিল্লাহ হোসেন তারেক, সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুজ্জামান জুয়েল, দপ্তর সম্পাদক নুরুল ইসলাম সোহেল, যুবদল ঢাকা মহানগর উত্তরের সাবেক যুগ্ন আহ্বায়ক এসএম মিজানুর রহমান রাজসহ যুবদলের বিভিন্ন ইউনিটের নেতাকর্মীরা।

