রাজধানীর মোহাম্মদপুরে এক প্রবাসীর কোটি টাকার বসতবাড়ি ও মূল্যবান সম্পত্তি দখলকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ কিশোর গ্যাংয়ের প্রকাশ্য সশস্ত্র তাণ্ডবের অভিযোগে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী ভূমিদস্যু চক্র জাল দলিল, ভয়ভীতি, সন্ত্রাসী হামলা এবং কিশোর গ্যাংকে ব্যবহার করে প্রবাসী জুবায়ের আহমেদের বৈধ সম্পত্তি দখলের চেষ্টা চালিয়ে আসছে। সর্বশেষ হামলার ঘটনায় সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো— ঘটনাস্থলে পুলিশ সদস্য উপস্থিত থাকার পরও হামলাকারীরা দেশীয় অস্ত্র হাতে প্রকাশ্যে তাণ্ডব চালিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগী পক্ষের অভিযোগ, স্থানীয় নেতা রাজেশের প্রত্যক্ষ মদদে এবং তার সহযোগী গিয়াস উদ্দিন, রেজাউল করিম ও যুবলীগের সাবেক ক্যাডার হিসেবে পরিচিত কালুর নেতৃত্বে সংঘবদ্ধ একটি সন্ত্রাসী বাহিনী ধারালো অস্ত্র, রামদা, চাপাতি ও লাঠিসোঁটা নিয়ে একাধিকবার প্রবাসীর বাড়িতে হামলা চালায়। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল ভয়ভীতি সৃষ্টি করে সম্পত্তি জবরদখলের পথ সুগম করা।
ঘটনার সূত্রপাত হয় প্রবাসীর সম্পত্তি জালিয়াতির মাধ্যমে দখলের অভিযোগের বিভিন্ন নথি ও প্রমাণ গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরার উদ্যোগকে কেন্দ্র করে। এ উদ্দেশ্যে বাড়ির নিরাপত্তা ইনচার্জ সোহাগ বিন সাইফুল্লাহ একটি জরুরি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন। কিন্তু সংবাদ সম্মেলন চলাকালেই অভিযোগ অনুযায়ী কালুর নেতৃত্বে সশস্ত্র ক্যাডার ও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা অতর্কিত হামলা চালিয়ে বাড়িতে ভাঙচুর করে এবং উপস্থিত সাংবাদিক, নিরাপত্তাকর্মী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রাণনাশের হুমকি দেয়। ভুক্তভোগীদের দাবি, পুরো ঘটনা বাড়ির সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণ হয়েছে, যেখানে হামলাকারীদের প্রকাশ্যে ধারালো অস্ত্র নিয়ে তাণ্ডব চালানোর দৃশ্য স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলার সময় ঘটনাস্থলে পুলিশ সদস্য উপস্থিত ছিলেন। তবে হামলাকারীরা কোনো ধরনের ভয়ভীতি ছাড়াই তাদের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যায়। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ দায়িত্ব পালনরত সাংবাদিক ও নিরাপত্তাকর্মীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়। তবে মূল হামলাকারীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা না নেওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র ও ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিতভাবে প্রবাসীর সম্পত্তি দখলের একটি ধারাবাহিক অপচেষ্টার অংশ। এর আগে চলতি বছরের ১ জুলাই একই চক্রের হামলায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ২ জুলাই মোহাম্মদপুর থানায় মামলা নং-১১ দায়ের করা হলেও অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও মামলার মূল আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়নি। বরং এই সুযোগে অভিযুক্তরা আরও বেপরোয়া হয়ে ২৮ জুলাই পুলিশের উপস্থিতিতেই পুনরায় অস্ত্রের মহড়া দিয়ে ভুক্তভোগীদের প্রাণনাশের হুমকি দেয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, মোহাম্মদপুরের কয়েকটি এলাকায় কিশোর গ্যাং ও ভূমিদস্যু চক্রের দৌরাত্ম্য আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। প্রবাসীদের ফাঁকা বাড়ি ও মূল্যবান সম্পত্তি টার্গেট করে জাল কাগজপত্র তৈরি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, হামলা এবং প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে সম্পত্তি দখলের অভিযোগ নতুন নয়। তবে দিনের আলোয় পুলিশের উপস্থিতিতে এমন প্রকাশ্য সশস্ত্র তাণ্ডব সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
এ ঘটনায় এলাকাবাসী অবিলম্বে উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত, জাল দলিলের মাধ্যমে সম্পত্তি দখলের অভিযোগের বিচার, অভিযুক্ত রাজেশ, গিয়াস উদ্দিন, রেজাউল করিম, কালুসহ হামলায় অংশ নেওয়া সকল ব্যক্তির দ্রুত গ্রেপ্তার এবং মোহাম্মদপুর এলাকায় কিশোর গ্যাং ও ভূমিদস্যু চক্রের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি প্রবাসী পরিবারের সদস্য, স্থানীয় বাসিন্দা, দায়িত্ব পালনরত সাংবাদিক এবং সাক্ষীদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করারও আহ্বান জানানো হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বিশ্লেষকদের মতে, কিশোর গ্যাং, ভূমিদস্যু চক্র ও প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশের অভিযোগ দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত না করা হলে রাজধানীতে সম্পত্তি দখলকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ অপরাধ আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। তাই এ ঘটনায় দোষীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রবাসীদের সম্পত্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।
(প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগগুলো ভুক্তভোগী পক্ষের বক্তব্য, উপস্থাপিত তথ্য ও অভিযোগের ভিত্তিতে তুলে ধরা হয়েছে। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে।)

