যশোর জুড়ে চলছে শীত মৌসুমে সবজি চাষ । সবজি চাষ নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন এ এলাকার কৃষকরা। জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখায়ায় মাঠের পর মাঠ জুড়ে আবাদ শুরু হয়েছে শীতকালীন সবজির। ফুলকপি, বাঁধাকপি, ওলকপি, মুলা, কচুরলতি, বেগুন, টমেটো, শিম, পটল, বরবটি ও শাকসহ সবজি চাষে ব্যস্ত স্থানীয় কৃষকরা। তাছাড়া মিষ্টি কুমড়া, ঝিঙা, করলা, শশা, ক্ষীরা, পেঁপে ও লাউ রয়েছে মাঠে ও বাজারে। মূলত সবজি চাষে খ্যাতি রয়েছে যশোরের। দেশের সবজির চাহিদার একটি বড় অংশ এই জেলায় উৎপাদিত হয় এ এলাকা থেকে। এসব সবজির বাজারে যেমন কদর রয়েছে, তেমনি দামও পাচ্ছেন কৃষকরা। এতে খুশি তারা। তাই বেশি লাভের আশায় পুরোনো ফসল তুলে আবারও সবজি চাষে মন দিয়েছেন তারা, সময় দিচ্ছেন মাঠে। কেউ জমিতে চাষ দিচ্ছেন, কেউ লাগাচ্ছেন চারা, আবার কেউ সেই চারায় পানি দিচ্ছেন এ দৃশ্য যশোরের প্রায় সব উপজেলার উঁচু জমিতে লক্ষ করা যায়। সবজি অঞ্চল হিসেবে খ্যাত চুড়ামনকাটি, বারীনগর, সাতমাইল, চৌগাছা, মণিরামপুর, ঝিকরগাছা, বাঘারপাড়া, অভয়নগর ও কেশবপুরের বিভিন্ন ঘেরপাড় এলাকায় চাষ হচ্ছে এসব সবজি। শুকুর আলী নামের এক কৃষক জানায় এখন সবজির দাম একটু বেশী তাই বেশি করে সবজি চাষ করছি। জেলা সদরের সাইফূল হোসেন জানান, এ বছর জমিতে বেগুন লাগিয়ে ৩ মাসে লক্ষাধিক টাকা বিক্রি করেছি। সব মিলিয়ে এই ক্ষেতে তার খরচ হয়েছে প্রায় ২৫ হাজার টাকা। ফলে শুধু বেগুন চাষে তার লাভ হয়েছে প্রায় ৭৫ হাজার টাকা। এখনো ক্ষেতে কিছু বেগুন গাছ আছে। তবে অনেক গাছ তুলে ফেলে সেখানে লাউ ও কুমড়ার চারা লাগাচ্ছেন তিনি। এছাড়াও অন্য এক খণ্ড জমিতে শশা এবং ক্ষীরা লাগিয়েছেন। ইতোমধ্যে ফসল উঠতে শুরু করেছে, সেখানেও লাভ পাচ্ছেন তিনি। এ এলাকার কৃষকরা জানান, বছরের পর বছর তারা সবজি চাষ করছেন। এই চাষের উপরেই পুরো সংসার চলে । তবে আবওয়া ভালো থাকায় আগাম ফসলে ভালো দাম পেয়েছি। তারা বলেন আগাম সবজি শেষের পথে, এখন শীতকালীন সবজির চাষ শুরু করেছেন। এছাড়াও কচু, ওল, পটল, বরবটি, শিম, পুঁইশাক ও ঢেঁড়স লাগিয়েছেন।চুরমন কাঠী এলাকার এক কৃষক জানান, বিভিন্ন খণ্ডে ভাগ করে সময় অনুযায়ী বিভিন্ন সবজি লাগান। তার ১০ শতক জমিতে বেগুন লাগিয়ে এ পর্যন্ত ৭৫-৭৬ হাজার টাকা পেয়েছেন। এ পর্যন্ত ২০-২২ হাজার টাকা খরচ হলে আরও ২ মাস বেগুন বিক্রি করতে পারবেন। ফলন ভালো এবং দামও ভালো জানিয়ে তিনি বলেন, গতকাল আড়তে নিয়ে গেলে বেগুন সাড়ে ৪২ টাকা কেজি দরে বিক্রি করতে পেরেছেন। অন্য জমিতে ইতোমধ্যে কপি, শাক ও টমেটো লাগাতে শুরু করেছেন। আরেক কৃষক বাদশা তার ১০ শতক জমিতে আগাম শীতকালীন সবজি হিসেবে বাঁধাকপি ও ৬ শতক জমিতে টমেটো লাগিয়েছিলেন। তিনি জানান, ফলন ও দাম ভালো পাওয়ায় এখন শীতকালীন সবজি হিসেবে অন্যান্য ফসল লাগাতে শুরু করেছেন। আশেপাশের আক্তার, সাইদসহ আরও কয়েকজন কৃষক জমি প্রস্তুত করছে, কেউ চারা লাগাচ্ছে। এবার দাম ও ফলন ভালো আছে, তাই লাভবান হওয়া যাবে বলে সবার আশা। তবে ডিজেলের দাম বেশি হওয়ায় কিছুটা সমস্যায় রয়েছে। ঠিকমতো সার ও কীটনাশক পাওয়া যাচ্ছে না বলেও জানান তারা। অনেক সময় অতিরিক্ত দাম দিয়ে সার সংগ্রহ করতে হচ্ছে জানিয়ে তারা জানান, এতে উৎপাদন ব্যয় বেশি হচ্ছে। ফলে বাজার দরও বেড়ে যায়। তারপরও এ বছর বাজারে চাহিদা ও দর ভালো থাকায় সবজি চাষে খরচ বাড়লেও লাভবান হবেন বলে আশা করেন তারা। কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, গতকাল পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ১ হাজার ২২৫ হেক্টরে বেগুন, ২৯২ হেক্টরে টমেটো, ৮০১ হেক্টরে শিম, ৪৪০ হেক্টরে ফুলকপি, ৭৭১ হেক্টরে বাঁধাকপি, ৬২৩ হেক্টরে মুলা, ৪৯৪ হেক্টরে মিষ্টি কুমড়া, ১ হাজার ৩৩১ হেক্টর জমিতে পটল ছিল। এছাড়া শীতকালীন হিসেবে লাগানো হচ্ছে ডাঁটা, কাঁকরোল, গাজর, ঢেঁড়স, লালশাক, সবুজ শাক, পালংশাক, ধনিয়াপাতা, বরবটি ও ক্ষীরাসহ বিভিন্ন সবজ।যশোরের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) কৃষিবিদ মো. আবু তালহা জানান, যশোর সবজি চাষে দেশের একটি উল্লেখযোগ্য এলাকা। সারাদেশে সবজি সরবরাহ করা হয় এখান থেকে। চলতি বছর আগাম সবজি চাষ হয়েছে প্রায় ৫ হাজার হেক্টর জমিতে। কিছুদিন আগে ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের কারণে মাঠে ‘জো কন্ডিশন’ রয়েছে। এ কারণে কৃষকরা মাঠে আবার নতুন সবজি চাষে দিনরাত কাজ করছেন।
তিনি আরও জানান, যশোরে এ বছর ১৮ হাজার ২৩০ হেক্টর জমিতে শীতকালীন সবজি চাষের লক্ষ্য ধরা হয়েছে। গত ৫ নভেম্বর পর্যন্ত ৫ হাজর হেক্টরের বেশি জমিতে সবজি চাষ সম্পন্ন হয়েছে।

