ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশের প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে একটি জাতীয় কমিটি গঠনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেছেন, রাষ্ট্রের কাছে সব নাগরিকের মর্যাদা সমান হওয়া উচিত।
বুধবার (২১ অক্টোবর) সকালে শারদীয় দুর্গাপূজা ও বিজয়া দশমী ২০২৬ উপলক্ষে বঙ্গভবনে আয়োজিত শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে হিন্দু সম্প্রদায়ের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। এ সময় রাষ্ট্রপতির সহধর্মিণী রাহাত আরা বেগমও অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে উঠে আসে বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সমাজব্যবস্থা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের গুরুত্ব। তিনি বলেন, মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানসহ সব ধর্মের মানুষ এ দেশের নাগরিক। সংবিধান প্রত্যেক নাগরিককে সমান অধিকার, মর্যাদা ও ধর্ম পালনের স্বাধীনতা দিয়েছে। এই সাংবিধানিক অধিকার বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত জরুরি।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধ, সহিংসতা ও ধর্মীয় বিদ্বেষের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেন রাষ্ট্রপতি। তাঁর মতে, ভিন্ন ধর্মের মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান দেশের সামাজিক শক্তি ও জাতীয় ঐক্যের অন্যতম ভিত্তি। এই ঐতিহ্য রক্ষায় সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
ধর্মীয় বিভাজন সৃষ্টির অপচেষ্টা সম্পর্কে সতর্ক করে তিনি বলেন, গুজব, অপপ্রচার ও উগ্রবাদ সমাজে অবিশ্বাস তৈরি করতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় সত্যনিষ্ঠা, সহনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চা বাড়ানো প্রয়োজন। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে অন্যায় ও বিভেদের বিরুদ্ধে সচেতন এবং সোচ্চার থাকার আহ্বান জানান তিনি।
রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, দেশের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রা কোনো একক জনগোষ্ঠীর প্রচেষ্টায় সম্ভব নয়; বরং সব মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণেই একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে উঠতে পারে। তাই জাতীয় ঐক্য বিনষ্টের যেকোনো প্রচেষ্টা প্রতিহত করে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সাম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামে সব ধর্মের মানুষের অবদান স্মরণ করে তিনি বলেন, সম্মিলিত ত্যাগ ও অংশগ্রহণ বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়কে শক্তিশালী করেছে। এই ঐতিহাসিক বন্ধন অটুট রাখাই হওয়া উচিত ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অন্যতম অঙ্গীকার।
বিজয়া দশমীর তাৎপর্য তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, এ উৎসব মানুষের কাছে অশুভের পরাজয় এবং সত্য, সুন্দর ও কল্যাণের প্রতিষ্ঠার বার্তা পৌঁছে দেয়। ধর্মীয় পরিচয়, বর্ণ কিংবা সামাজিক অবস্থানের কারণে কোনো নাগরিক যেন বৈষম্য, বঞ্চনা বা নিপীড়নের শিকার না হন, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব।
তিনি জানান, সব ধর্মের মানুষ যাতে নির্বিঘ্নে ও আনন্দের সঙ্গে নিজ নিজ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করতে পারেন, সে জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং প্রশাসনকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানের শুরুতে বঙ্গভবনের ক্রিডেনশিয়াল হলে রাষ্ট্রপতিকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান হিন্দুধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট, বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান কল্যাণ ফ্রন্ট, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ এবং মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির নেতারা। পরে রাষ্ট্রপতি উপস্থিত অতিথি ও দর্শনার্থীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।
অনুষ্ঠানে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন, প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ শামীম কায়সার, প্রধানমন্ত্রীর হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও নৃ-গোষ্ঠীবিষয়ক বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকারসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

