রাত পোহালে বরিশাল ও খুলনা সিটিতে নির্বাচন। ইতি মধ্যে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট সম্পন্নের জন্য সকল প্রস্তুতি নিয়েছে প্রশাসন। দুই নগরের বাসিন্দারাও উৎসবমুখর ভোটের অপেক্ষায় রয়েছেন। পরিবেশ দেখে মনে হচ্ছে ঈদের আমেজ বিরাজ করছে সর্বত্রে। ইতোমধ্যে কেন্দ্রে কেন্দ্রে পৌঁছে গেছে ইভিএমসহ অন্যান্য সরঞ্জাম। সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন নির্বাচন কর্মকর্তারা। অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীও। রোববার অস্থায়ী নির্বাচনী কার্যালয়ে প্রিজাইডিং কর্মকর্তাদের বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে অমোচনীয় কালি, ইভিএমসহ অন্যান্য সরঞ্জাম। প্রথমবারের মতো এই দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইভিএমে ভোট হবে। নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করতে সব ধরনের প্রস্তুতি রাখা হয়েছে বলে জানান রিটার্নিং কর্মকর্তা। এই দুই সিটিতে সকাল ৮টা থেকে শুরু হবে ভোটগ্রহণ, চলবে বিকেল ৪টা পর্যন্ত। এদিকে ভোট দিতে ভোটারদের ভোট কেন্দ্রে আসার জন্যও আহ্বান জানিয়েছেন বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবির । রোববার বেলা সাড়ে ১১টায় বরিশাল নগরীর বান্দ রোডের জেলা শিল্পকলা একাডেমি থেকে নির্বাচনী সামগ্রী বিতরণ শুরু কালে রিটার্নিং কর্মকর্তা এসব কথা বলেন। প্রথমবারের মতো এবার বরিশালের সবগুলো কেন্দ্রে ইভিএম মেশিনে ভোট গ্রহণ হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ইভিএমএ ভোট দেওয়ার বিষয়ে প্রতীক বরাদ্দের পরই প্রতিটি ওয়ার্ডে একটানা ভোটারদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এতে ভোটারদের মাঝে বেশ আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে, পাশাপাশি তাদের ব্যাপক সাড়ার কারণে নির্ধারিত সময়ের বেশি থেকেও প্রশিক্ষণ দিতে হয়েছে আমাদের। ফলে আশা করছি কেন্দ্রে ভোটার সমাগম ঘটবে এবং সুষ্ঠু পরিবেশে তারা ভোট দিতে পারবে। তিনি বলেন, ১২৬টি কেন্দ্রের ৮৯৪টি বুথের জন্য দেড় হাজার ইভিএম মেশিন রাখা হয়েছে। সকাল থেকে ইভিএম মেশিনসহ নির্বাচনী সামগ্রী প্রিসাইডিং অফিসারদের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। বুঝে নেওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে স্ব স্ব কেন্দ্রে চলে যান প্রিসাইডিং অফিসাররা। এছাড়া ১২৬টি ভোট কেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রায় ১২শ সিসি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। গোটা নির্বাচনী এলাকাকে নিরাপত্তার চাঁদরে ঢেকে ফেলতে সাড়ে ৪ হাজার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হবে বলে জানিয়েছেন পুলিশ কমিশনার মো. সাইফুল ইসলাম। প্রতি কেন্দ্রে ১২ জন করে আনসার সদস্য মিলিয়ে ১ হাজার ৫১২ জন অনসার সদস্য কেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করবেন বলে জানানো হয়েছে। এছাড়া র্যাবের ১৬টি টিম স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে কাজ করছে। এর পাশাপাশি দশ প্লাটুন বিজিবি, ৩০ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং দশজন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানিয়েছেন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাহাঙ্গীর হোসেন। এছাড়া সকাল থেকে বরিশাল নগরের প্রতিটি মোড়ে মোড়ে টহল পুলিশ তল্লাশি চালাচ্ছে। নগরজুড়ে বিজিবির টহল অব্যাহত রয়েছে। বহিরাগতদের নগরী ছাড়ার জন্য কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে প্রশাসন। তবে নির্দেশনা উপেক্ষা করে বহিরাগত জারা এখনো অবস্থান করছেন তাদের বিরুদ্ধও ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানায় পুলিশ। বরিশাল নির্বাচন কমিশন সূত্র জানায়, সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের ৩০টি ওয়ার্ডের ১২৬টি কেন্দ্রের ৮৯৪ টি কক্ষে প্রিসাইর্ডিং অফিসার দায়িত্ব পালন করবে ১২৬ জন, সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার ৮৯৪ জন ও পুলিং অফিসার এক হাজার ৭৮৮ জন আর ইভিএম মেশিন সরবরাহ করা হয়েছে মোট এক হাজার ৮শ। এবার বরিশাল সিটি নির্বাচনের সাত মেয়র, ১১৯ জন সাধারণ ও ৪২ জন সংরক্ষিত কাউন্সিলর প্রার্থী অংশ নিয়েছেন। মোট ভোটার দুই লাখ ৭৬ হাজার ২৯৮ জন। এর মধ্যে এক লাখ ৩৭ হাজার ৪৮৯ জন পুরুষ ও এক লাখ ৩৮ হাজার ৮০৯ জন নারী ভোটার রয়েছেন। অপরদিকে নির্বাচনের পরিবেশ সুষ্ঠু রাখতে মাঠে থাকবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী। খুলনায় ১১ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। র্যাব-৬ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফিরোজ কবির বলেন, আমরা সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত রয়েছি, যাতে করে নগরের প্রতিটি ভোটার ভোটকেন্দ্রে গিয়ে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ও নিরাপদে তার ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পান। খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) পুলিশ কমিশনার মো. মাসুদুর রহমান ভূঞা বলেন, চার হাজার ৮২০ জন পুলিশ নিয়মিত ডিউটি করবে এবং একই সঙ্গে তিন হাজার ৪৬৮ জন আনসার সদস্য মোতায়েন থাকবে। এবিষয়ে খুলনা সিটি নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দিন জানান, নির্বাচনে খুলনায় মেয়র পদে ৫ জন এবং ৩১টি সাধারণ ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে ১৩৬ জন এবং ১০টি সংরক্ষিত ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে ৩৯ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এরইমধ্যে নগরীর ১৩ ও ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে দুজন কাউন্সিলর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি আরও জানান, এবারের নির্বাচনে ভোট নেয়া হবে ইভিএমে। নগরীর ৩১টি ওয়ার্ডে ২৮৯ ভোটকেন্দ্রের ১ হাজার ৭৩২টি ভোটকক্ষে ভোটগ্রহণ করা হবে। ভোটকেন্দ্র সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের জন্য মোট ২ হাজার ৩১০টি সিসি ক্যামেরা স্থাপনের কাজ এরইমধ্যে শেষ হয়েছে। খুলনায় ২৮৯টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১৬১টি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। রিটার্নিং কর্মকর্তা জানান, ভোট কেন্দ্রগুলোতে স্থাপন করা হয়েছে ২ হাজার ৩০০টি ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা। পর্যবেক্ষক থাকবেন বেসরকারি দুটি সংস্থার ২০ জন ও নির্বাচন কমিশনের ১০ জন। ভোট গ্রহণ কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে ভোটগ্রহণের দায়িত্বে থাকবেন ৫ হাজার ৭৬০ জন কর্মকর্তা। কেসিসি নির্বাচনে ২৮৯টি ভোটকেন্দ্রে ৫ লাখ ৩৫ হাজার ৫২৯ জন তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। এর মধ্যে নারী ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ৬৬ হাজার ৬৯৬ এবং পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৬৮ হাজার ৮৩৩ জন। ভোট শেষে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করা হবে জেলা শিল্পকলা একাডেমি অডিটোরিয়ামে। এবিষয়ে খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী তালুকদার আব্দুল খালেক বলেন, আমি এলাকার প্রত্যেকের সঙ্গে গণসংযোগ করেছি, তাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেছি। তারা যেন নৌকায় ভোট দেন। আমি নির্বাচিত হলে খুলনাকে একটি মডেল নগরীতে পরিনত করবো। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, বিরোধী দল জাতীয় পার্টি, জাকের পার্টি ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থীসহ স্বতন্ত্র প্রার্থী এই দুই সিটিতে ভোটের লড়াইয়ে থাকলেও বিএনপি না থাকায় অনেকটা প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন আরেকটি নির্বাচন হতে যাচ্ছে। খুলনার মেয়র প্রার্থীরা হলেন তালুকদার আব্দুল খালেক (বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, নৌকা প্রতীক), মো. আ. আউয়াল (ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, হাত পাখা), মো. শফিকুল ইসলাম মধু (জাতীয় পাটি, লাঙ্গল), এস এম শফিকুর রহমান (স্বতন্ত্র, টেবিল ঘড়ি) এবং এস এম সাব্বির হোসেন (জাকের পার্টি, গোলাপ ফুল)। উল্লেখ্য, পৌরসভা থেকে ১৯৯০ সালে খুলনাকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করা হয়। এরপর ১৯৯৪ সালে প্রথম মেয়র হিসেবে নির্বাচনে জয়ী হন বিএনপির শেখ তৈয়বুর রহমান, ২০০২ সালের নির্বাচনেও জয়ী হন তিনি। এরপর ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের তালুকদার আব্দুল খালেক, ২০১৩ সালে বিএনপির মো. মনিরুজ্জমান মনি এবং ২০১৮ সালে ফের তালুকদার আব্দুল খালেক মেয়র নির্বাচিত হন। এবাও খুলনা সিটি করপোরেশনে চেয়ার তার দখলে তাকবে বলে মনে করেন অনেকে।খুলনা সিটি করপোরেশনের ৩১টি ওয়ার্ডের আওতায় ভোটকেন্দ্র রয়েছে ২৮৯টি। এগুলোর মধ্যে এবার নির্বাচনে ১৬১টি কেন্দ্রকে ‘গুরুত্বপূর্ণ বা ঝুঁকিপূর্ণ’ ও ১২৮টি কেন্দ্রকে সাধারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে খুলনা মহানগর পুলিশ।তবে বরিশাল সিটির বাসিন্দারা। নৌকার নতুন প্রার্থী আবুল খায়ের আবদুল্লাহ খোকন সেরনিয়াবাত জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। হঠাৎ করেই এবার মাঠ গরম করে শক্ত অবস্থান জানান দিচ্ছেন হাতপাখার প্রার্থী মুফতী সৈয়দ মো. ফয়জুল করিম। যদিও এই ভোটের সমীকরণ জটিল করে দিয়েছে লাঙ্গলের ইকবাল হোসেন তাপস। আর সাবেক বিএনপির মেয়র কামালপুত্র রুপম বিএনপির প্রকাশ্য সমর্থন না পেলেও তলে তলে তিনি ধানের শীষের ব্যাংকের ভোট কুড়াবেন বলেই মনে করছেন ভোটাররা। তাই এবারের ভোটযুদ্ধ হচ্ছে চতুর্মুখী। বরিশালের মেয়র প্রার্থী নতুন মুখ আওয়ামী লীগের আবুল খায়ের আবদুল্লাহ (নৌকা), জাতীয় পার্টির ইকবাল হোসেন তাপস (লাঙ্গল), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করিম (হাতপাখা), জাকের পার্টির মিজানুর রহমান বাচ্চু (গোলাপ ফুল), স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. কামরুল আহসান (ঘড়ি, বিএনপি), আসাদুজ্জামান (হাতি) ও আলী হোসেন (হরিণ)। এখন অপেক্ষার পালা ,দুই সিটিতে শেষ হাসি কে হাসে।

