আলোচিত ইউটিউবার আশরাফুল হোসেন যিনি হিরো আলম নামে সকলে তাকে চেনে ও জানে। সঙ্গীতের ভিডিও, মডেলিং, হাস্য রসাত্মক অভিনয় ও গায়ক হিসেবে দর্শকদের মধ্যে বহুল উচ্চারিত নাম। তবে বিভিন্ন সময় নির্বাচনে অংশ নিয়েও তিনি প্রাদপ্রদীপের নিচে চলে এসেছেন। এবার বগুড়ার দুই আসন থেকে নির্বাচন করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। ১ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে একটি আসনে তিনি অল্প ভোটের ব্যবধানে হেরে যান। এরপর হয়ে উঠেন টক অব দ্য কান্ট্রি। তাকে নিয়ে সর্বত্র আলোচনার ঝড় বইছে। আশরাফুল হোসেন বলেন, আগে আমাকে অনেকে মানুষ মনে করেনি। তবুও আমি থেমে যায়নি। এবিষয়ে হিরো আলম বলেন আমি প্রত্যাশার থেকেও বেশি ভোট পেয়েছি। ভোটের মাঠে এবার জনগণ যাওয়ার কথা ছিল না। আমার জন্য শুধু ভোট কেন্দ্রে গিয়েছিল ভোটাররা। আমি না দাঁড়ালে ভোট কেন্দ্রে এত লোক কখনই উপস্থিত হতো না। আমি কিন্তু ভোটে হারিনি, তবে ফলাফলে হারিয়েছে সরকার। নির্বাচনে কোনোভাবে আমাকে পেছনে ফেলতে না পেরে ফলাফল পরিবর্তন করে হারিয়েছে আমাকে। আমি কোন দলের প্রার্থী ছিলাম না। অনেকে আমাকে বিএনপির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।কিন্ত আসলে আমি কোন দল করিনা।আমি জাতীয় পাটি থেকে মনোনয়ন চেয়েছিলাম । অনেকে আমার নানা বিধ দোশ দিযে চলেছে। আমি ধৈর্য ধারন করছি। আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে থাকেন। আমি ধৈর্য ধরেছি। মানুষ একসময় আমি কোনোকিছু করলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করত, গালি দিত- এটা আমি বুঝতে পারতাম ,তারপরও লেগে থাকতাম। তবে আমি বিশ্বাস করতাম, শত্রুরাও আমাকে বুকে টেনে নেবে। মানুষের ভুল ভাঙবে। সেটা ভেঙেছে।আজ আমি হিরো আলম হয়েছি। ইতোমধ্যে আমি কাজের পরিবর্তন এনেছি। হাস্যকর, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করবে মানুষ এমন কাজ করব না। মানুষের যে ভালোবাসা পেয়েছি, সেই ভালোবাসা ধরে রাখার জন্য সব সময় ভালো কাজের মধ্যে থাকব। নির্বাচন বিষযে হিরো আলম বলেন, ফল পুনর্গণনার জন্য আবেদন করেছি। দেখি কি রেজাল্ট আসে। সেটার পরিপ্রেক্ষিতে পরবর্তী পরিকল্পনা নির্ধারণ করব। ইতিবাচক ফলাফল না আসলে অবশ্যই আদালতে যাব। এ রকম মারধর করে নির্বাচন হলে অংশ নেওয়া আর না নেওয়া সমান। এখন পর্যন্ত স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেই নির্বাচণে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা আছে। সময়সাপেক্ষে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হতেও পারে। হিরো আলম বলেন আমি আমার কাজ করে চলেছি। উলেখ্য, হিরো আলম একজন বাংলাদেশী সঙ্গীত ভিডিও মডেল, অভিনেতা, গায়ক এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচিত ব্যক্তি। তার একাডেমিক শিক্ষা না থাকলেও তিনি প্রতিভাবান। তিনি একজন স্বাধীন শিল্পী হিসাবে কাজ করেন ও সামাজিক প্ল্যাটফর্মগুলিতে ভিডিও প্রকাশ করে থাকেন। তিনি মূলত তার বেসুর গলায় গানের জন্য সর্বাধিক আলোচিত, সমালোচিত। এই কারণে তিনি বিভিন্ন ইন্টারনেট মিমের উপাদানে পরিণত হয়েছেন। তবু তিনি ভাইরাল।২০১৮ সালে হিরো আলম একাদশ সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-৪ আসনে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়ে পুনরায় আলোচনায় আসেন। ২০২২ সালের ১০ ডিসেম্বর বিএনপির সংসদ সদস্যরা পদত্যাগ করলে বগুড়ার বগুড়া-৬ (সদর) এবং বগুড়া-৪ (কাহালু-নন্দীগ্রাম) আসনে উপ-নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। হিরো আলম স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দুটো আসনেরই মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন। ২০২৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে তিনি অল্প ভোটের ব্যবধানে উভয় আসনে পরাজিত হন। আশরাফুল আলম সাঈদ ১৯৮৫ সালের ২০ জানুয়ারি বগুড়া জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম আব্দুর রাজ্জাক, মা আশরাফুন বেগম। হিরো আলম প্রথম দিকে নিজ গ্রাম এরুলিয়ায় সিডি বিক্রির কাজ করতেন এবং পরবর্তীতে স্যাটেলাইট টিভি সংযোগের (ক্যাবল পরিচালনা) ব্যবসায় নামেন। ক্যাবল সংযোগের ব্যবসা চলাকালে শখের বশে তিনি সঙ্গীত ভিডিও নির্মাণ শুরু করেন।আশরাফুল আলমের ইউটিউবে আপলোড করা সঙ্গীত ভিডিও নিয়ে ২০১৬ সালের দিকে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম বিশেষ করে ফেসবুকে বাংলাদেশের ব্যবহারকারীরা ট্রল এবং মিম তৈরি শুরু করলে দ্রুতই তিনি পরিচিত হয়ে উঠেন।এসময় মুশফিকুর রহিমসহ আরও বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি তারকা আশরাফুল আলমের সাথে সেলফি তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করেন।এরপর বিবিসি হিন্দি, জি নিউজ, এনডিটিভি, ডেইলি ভাস্কর, মিড-ডেসহ ভারতের প্রথম সারির সংবাদমাধ্যমগুলো তাকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।ফলে তিনি ভারতীয় ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের মাঝে আলোচিত হন। ইয়াহু ইন্ডিয়ার এক জরিপ অনুসারে সেসময় ভারতীয় অভিনেতা সালমান খানের চেয়ে আলমকে বেশিবার গুগলে অনুসন্ধান করা হয়েছে।১১ আগস্ট ২০১৭ তারিখে আশরাফুল আলম অভিনীত প্রথম ছবি মার ছক্কা মুক্তি পায়।২০১৮ সালে তিনি বিজু দ্য হিরো নামে একটি বলিউড চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য চুক্তিবদ্ধ হন। এছাড়া বাংলাদেশে বেশকিছু বিজ্ঞানপনচিত্র ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন।২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে নিয়ে আবার আলোচনায় আসেন। ২০১৮ সালের গুগল অনুসন্ধানের প্রবণতায় বাংলাদেশে দশম অবস্থানে থাকেন হিরো আলম। ১৬ অক্টোবর ২০২০ মুক্তি পায় হিরো আলমের দ্বিতীয় সিনেমা ‘সাহসী হিরো আলম’। সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন এ আর মুকুল নেত্রবাদী আর প্রযোজনা করেন হিরো আলম নিজেই। হিরো আলমের বিপরীতে অভিনয় করেন তিন নায়িকা সাকিরা মৌ, রাবিনা বৃষ্টি ও নুসরাত জাহান। পরে তিনি গান গাওয়ার প্রতি মনোনিবেশ করেন ও তার প্রথম গান ছিল “বাবু খাইছো”।এরপর তিনি বেশ কিছু গান ও ভিডিও ইন্টারনেটে ছাড়েন, যার মধ্যে অন্যতম ছিল কয়েকটি রবীন্দ্র সঙ্গীত ও নজরুলগীতি। তবে রবীন্দ্র সঙ্গীত ও নজরুলগীতি ছাড়ার পর তার বিরুদ্ধে এগুলো বিকৃত করে গাওয়ার অভিযোগ ওঠে। ২০২২ সালের ২৭ জুলাই, বাংলাদেশে পুলিশের গোয়েন্দা শাখা হিরো আলমকে তাদের কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে যায়। পরে কখনও অনুমতি ছাড়া পুলিশের পোশাক পরবেন না, বিকৃত করে রবীন্দ্র ও নজরুল সঙ্গীত গাইবেন না মর্মে মুচলেকা দিয়ে ছাড়া পান। ছাড়া পেয়ে হিরো আলম বাংলাদেশের পুলিশের বিরুদ্ধে তার প্রতি মানসিক নির্যাতন ও অশোভন আচরণ করার অভিযোগ আনেন। হিরো আলমের উক্তি অনুসারে পুলিশ তাকে বলে যে, “তোর চেহারা কি হিরোর মতো? আয়নায় একবার নিজের চেহারা দেখেছিস? হিরোদের চেহারা কেমন হয় সিনেমায় দেখিস না? তোর হিরো আলম নাম পরিবর্তন করবি”। পরে হিরো আলমকে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের গান গাইতে নিষেধ করায় গোয়েন্দা পুলিশের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা হয়। এছাড়া নাম থেকে ‘হিরো’ শব্দটি বাদ দেওয়া ও চেহারা নিয়ে তাচ্ছিল্য করার বিষয়টিকে অনেকে বর্ণবাদী আচরণ বলে আখ্যায়িত করেন। বিষয়টি বিবিসি, এএফপি-সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেরও খবর হয়।

