মত প্রকাশ ও তথ্য পাওয়ার যে আইনি অধিকার সাংবাদিকদের রয়েছে, তা প্রতিনিয়তই কমবেশী বদলে যাচ্ছে। সাথে শারীরিক ঝুঁকি আর আর্থিক ক্ষতি তো, একরকম সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাংবাদিকরা অধিকার কবে ফিরে পাবে কবে ? এ প্রশ্ন এখন সকল সাংবাদিকদের মধ্যে বিরাজমান। সাংবাদিক রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ ,যদি তাই হয় তাহলে কেনো আজ সাংবাদিকরা তাদের অধিকার ফিরে পারে না। বর্তমানে সাংবাদিক নির্যাতন চরম আকারে বেড়েছে। দুর্নীতি ও অনিয়মের সংবাদ সংগ্রহকালে সাংবাদিকদের ওপর ধারাবাহিক হামলা,মামলা ও হয়রানী যেন এখন স্বাভাবিক ভাবে চলছে। এ ক্ষেত্রে প্রশাসন যেন দেখে না দেখার ভ্যান করছে। গত ৭ মাসে প্রায় ১২৫ সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। গত ১৫ বছরে ২৩ জন সাংবাদিক হত্যার শিকার হয়েছেন; আহত হয়েছেন ৫৬১ জন । আরেকটি হিসাবে বলা হচ্ছে, ১৯৯৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ২২ বছরে বাংলাদেশে ৩৫ জন সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। উলেখ্য গত তিনদিন আগে পিরোজপুর জেলার ইন্দুরকানী উপজেলার দৈনিক জনতা ও ডিটেকটিভ নিউজের প্রতিনিধিকে গুরুত্বর জখম করে সন্ত্রাসীরা। বমর্তমানে সাংবাদিক কামরুল খুলনা মেডিকেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। এ বিষয়ে ভূক্তভোগীরা ইন্দুরকানী থানায় অভিযোগ করে কিন্তু এখনো তার অভিযোগটি মামলা হিসাবে গ্রহন করেনি। এ বিষয়ে সাংবাদিকরা ইন্দুরকানী থানার ওসির নিকট জানতে চাইলে তিনি সাংবাদিকদের অকথ্য ভাষায় গালি গালাজ করে। এ ঘটনায় ঢাকা প্রেস ক্লাব,ফেডারেশন অব বাংলাদেশ জান্নালিষ্ট অরগানাইজেশন,বাংলাদেশ ন্যাশনাল নিউজ ক্লাব,দক্ষিন অঞ্চল সাংবাদিক ইউনিয়ন,বাংলাদেশ রিপোর্টার সোসাইটি,বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার সোসাইটি,ইন্দুরকানী প্রেস ক্লাবসহ অসংখ্য সংগঠন তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানালেও কোন টনক নড়েনি কতৃপক্ষের। এমনি ভাবে প্রতিনিয়ত সাংবাদিক হয়রানীর স্বিকার হচ্ছে। সাংবাদিক গুম ও খুন হচ্ছে কিন্তু কোন বিচার হচ্ছে না। এ জন্য দায়ী কে? আমরা কোথায় গেলে বিচার পাবো। বর্তমানে পুলিশ প্রশাসন সাংবাদিকদের শত্রু মনে করেন। ফলে আমরা হয়রানীর স্বিকার হতে হচ্ছে বেশী। প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানাযায় এত সাংবাদিক নিহত হলেন, অথচ বিচার শেষ হয়েছে মাত্র আটটির। এই আটটির বিচারিক রায়ের পাঁচটিই ভুক্তভোগীর পরিবারের সদস্যরা প্রত্যাখ্যান করেছেন বলে জানিয়েছে রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস। তাহলে বিচার হলো কার? বিচার না পাওয়া ব্যক্তিদের দলে রয়েছে সাংবাদিক সাগর-রুনির সন্তান মেঘ। রক্ত হিম করা এই যুগল হত্যাকাণ্ডের অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার তারিখ ৯ বছরে ৭৭ বারের মতো পেছাল। এ ছাড়া সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে করা বহুল আলোচিত ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮’র ১৪ টি ধার এখন সাংবাদিকতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। সাংবাদিক সংগঠনগুলি এই সব ধারা পরিবর্তনের দাবী করলেও কোন ফল পাওয়া যায়নি। একুট পিছনে ফিরলে দেখা যাবে আর্টিকেল নাইনটিন বলেছে, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত সারা দেশে সাংবাদিকদের ওপর ৬২টি শারীরিক হামলা হয়েছে। এ সময়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ২৩ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ১০টি মামলায় ৩ জন সাংবাদিককে গ্রেফতার করা হয়। ২০২১ সালে ৭১ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ৩৫টি মামলায় ১৬ জন সাংবাদিক গ্রেফতার হন। সচেতন নাগরিক, গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের ওপর এসব ঘটনার প্রভাবে দেশে একটি ভয়ের পরিবেশ ও সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে আর্টিকেল নাইনটিন।আমি জানি সাংবাদিকতা মানে জান ও জবানের স্বাধীনতা। নিরাপদ ও আইনি মৃত্যুর নিশ্চয়তা না থাকলে, কথা বলার স্বাধীনতা না থাকলে সাংবাদিকতা হয়ে দাঁড়ায় পানি ছাড়া মাছের মতো। আমি জানি আইন সকলের জন্য সমান। যদি কোন সাংবাদিক গুরুতর অপরাধের সাথে জড়িত থাকে তার শাস্তি হউক কিন্ত কেন একজন সাংবাদিক একটি নিউজের জন্য হয়রানীর স্বিকার হবেন। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের নামে সৎ সাংবাদিকতার টুঁটি চিপে ধরা, মামলা-হামলা-গ্রেপ্তার-নির্যাতন আর কিছু নয়, অসৎ মানুষদের প্রতিহিংসা। বিপুল ক্ষমতাশালী মানুষদের ক্রোধ ও আক্রমণের মুখে সবচেয়ে অসহায় মফস্বল সাংবাদিকেরা। মামলা হলে তা সামলানো কিংবা হামলা হলে বিচার চাওয়ার হুজ্জত মোকাবিলা করা সাধারণ সাংবাদিকদের পক্ষে অসম্ভব, যদি তাঁদের প্রতিষ্ঠান পাশে না দাঁড়ায়। তাই আমি সকল সাংবাদিক সংগঠনগুলিকে ঐক্য বন্ধ ভাবে আন্দোলনের আহবান জানায়। রক্তের দাগ শুকিয়ে যাবে, কবরে ঘাস গজাবে, মানুষও সাংবাদিকতা পেশার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিহত মানুষদের ভুলে যাবে। যদি সংবাদপত্রের কাগজগুলো সাদাই থাকত, টেলিভিশনের পর্দা দিনরাত ঝিরঝির করত আর অনলাইন পোর্টালগুলোতে লেখা থাকত ‘৪০৪ সিস্টেম এরর’—তাহলে হয়তো সাংবাদিকতার জরুরত মালুম হতো অনেকের। সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতনকে তখন এতটা ‘স্বাভাবিক’ মনে হতো না। কিন্তু প্রতিকূল পরিবেশে সে উপায়ও নেই গণমাধ্যমের। একদল সাংবাদিক তবু পেশাগত পবিত্রতা মাথায় নিয়ে পবিত্র প্রাণীর মতো অপঘাতের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে যান। পরাজয় জেনেও যিনি লড়াই করে যান, তাঁকেই বলে সংশপ্তক। বাংলাদেশের সাংবাদিকতা এখন সংশপ্তক পর্ব পার করছে।

