কুমিল্লার মুরাদনগরে স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ‘ষড়যন্ত্রমূলক’ প্রতিবেদনের প্রতিবাদে আয়োজিত বিক্ষোভে হামলার অভিযোগ উঠেছে বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে।ঘটনার পর দুই পক্ষের নেতাকর্মীদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে ৫ সাংবাদিকসহ অন্তত ৩৫ জন আহত হয়েছেন। বুধবার পাঁচটা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত উপজেলা সদরের আল্লাহু চত্বরে এসব ঘটনা ঘটে।স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের অনুসারীরা একটি টিভি চ্যানেলে প্রচারিত সংবাদের প্রতিবাদ জানিয়ে ‘নাগরিক সমাজ’-এর ব্যানারে বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করেন।একই সময় উপজেলা ছাত্রদলও বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ‘মিথ্যা মামলা ও গ্রেপ্তারের’ প্রতিবাদে বিক্ষোভের ডাক দেয়। দুই মিছিল কাছাকাছি আসতেই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।পরে দুই পক্ষের মধ্যে ইট-পাটকেল ছোড়াছুড়ি শুরু হলে কমপক্ষে ৩৫ জন আহত হন।‘নাগরিক সমাজ’-এর আহ্বায়ক মিনাজুল হক বলেন, কয়েক দিন আগে কায়কোবাদের এক অনুসারীকে চাঁদাবাজির অভিযোগে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে কায়কোবাদের লোকজন থানায় হামলা করে ওই চাঁদাবাজকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করে।
এসব ঘটনায় কায়কোবাদের অনুসারীরা উপদেষ্টা আসিফের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছেন। তাঁরা আসিফের বিরুদ্ধে একের পর এক বিষোদ্গার করছেন।কয়েকটি গণমাধ্যমে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আসিফের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। এ ঘটনায় আজ বিকেলে মুরাদনগরের সর্বস্তরের জনগণ প্রতিবাদ সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করে। প্রশাসন থেকে অনুমতি নিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে তাঁরা কর্মসূচি পালন করছিলেন।কর্মসূচির শেষ দিকে এসে কায়কোবাদের অনুসারীরা হঠাৎ শত শত ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে হামলা চালায়। এতে তাঁদের অন্তত ৬০ জন আহত হয়েছেন।অন্যদিকে, মুরাদনগর উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক কামাল উদ্দিন ভূইয়া পাল্টা অভিযোগ করে বলেন, আমাদের পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচির বিপরীতে উপদেষ্টা আসিফের লোকজন ইচ্ছে করে পাল্টা কর্মসূচির নামে সংঘর্ষ বাধায়। তারা আমাদের দলীয় কার্যালয়েও ভাঙচুর চালায়। ঘটনায় আমাদের অন্তত ১৫ জন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন, ৪ জনের অবস্থা গুরুতর।প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, হঠাৎ আসিফের অনুসারীদের সমাবেশে অন্য প্রান্ত থেকে ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু হয়। আসিফের অনুসারীরা কায়কোবাদের অনুসারীদের ধাওয়া দিলে তাঁরা কিছুটা পেছনে গিয়ে পাল্টা ধাওয়া দেন। এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু হয়। এ সময় ঘটনাস্থলে থাকা অন্তত পাঁচজন সাংবাদিককে পিটিয়ে ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে আহত করা হয়। পরে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধলে উপস্থিত লোকজন ও ব্যবসায়ীরা দোকানপাট বন্ধ করে দিগ্বিদিক ছোটাছুটি শুরু করেন। মুহূর্তের মধ্যে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
একপর্যায়ে আসিফের অনুসারীরা মুরাদনগর থানার সামনে গিয়ে অবস্থান নেন। আর কায়কোবাদের অনুসারীরা আল্লাহু চত্বরসহ দলীয় কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে আসিফের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে থাকেন।আহত সাংবাদিকেরা হলেন, বেসরকারি টেলিভিশন স্টার নিউজের জেলা প্রতিনিধি আবদুল্লাহ আল মারুফ, খোলা কাগজের জেলা প্রতিনিধি শাহ ইমরান, এস এ টিভির ক্যামেরাপারসন এ এস বাপ্পী, নয়াদিগন্তের মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার ফাহিম মুনতাছিম প্রমুখ। সাংবাদিক আবদুল্লাহ আল মারুফ বলেন, ‘হামলাকারীদের একজন আমার পায়ে লোহার রড দিয়ে এলোপাতাড়ি পেটাতে থাকে। আমাকে বারবার বলছিল, “ভিডিও বন্ধ কর, ক্যামেরা বন্ধ কর”। আসিফের অনুসারীদের ওপর যারা প্রথমে হামলা করেছিল, তারাই সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালায়।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের (বর্তমানে কার্যক্রম স্থগিত) উপজেলার আহ্বায়ক উবায়দুল সিদ্দিকী বলেন, কায়কোবাদের অনুসারীরা কিছু হলেই আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার শুরু করেন। আসিফ মাহমুদ দীর্ঘদিনের অবহেলিত মুরাদনগরের উন্নয়ন করছেন, এটা তাঁদের সহ্য হচ্ছে না। তাঁরা মুরাদনগরের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করতে চান। আজকে প্রশাসন থেকে অনুমতি নিয়ে তাঁরা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করছিলেন। কিন্তু তাঁরা পরিকল্পিতভাবে হামলা চালিয়েছেন। পুলিশ তাঁদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।এ ঘটনার পর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মহিউদ্দিন (অঞ্জন) দলীয় কার্যালয়ের সামনে এ নিয়ে কথা বলেন। তিনি এ ঘটনার জন্য আসিফ মাহমুদের লোকজনকে দায়ী করেন। মহিউদ্দিন বলেন, গত দুই দিন বিএনপি বিভিন্ন কর্মসূচি করছে। আজ ছাত্রদলের কর্মসূচি ছিল। তাদের লোকজন বিক্ষোভ মিছিল করতে দলীয় কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়েছিল। তখন ওই পক্ষের সমাবেশ থেকে দলীয় কার্যালয় লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়া হয়। পরে নেতা-কর্মীরা তাঁদের ধাওয়া দেন। তাঁরা তাঁদের নেতা কায়কোবাদকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ স্লোগান দিয়েছেন। তাঁদের হামলায় অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন। মহিউদ্দিনের দাবি, বিএনপি কোনো কর্মসূচি ঘোষণা করলেই তাঁরা পাল্টা কর্মসূচি ঘোষণা করে বিশৃঙ্খলার চেষ্টা করেন। আসিফ মাহমুদের নির্দেশে একের পর এক মিথ্যা মামলা দিয়ে বিএনপির নেতা-কর্মীদের হয়রানি করা হচ্ছে। যারা সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালিয়েছে, তারা এনসিপির লোকজন। আর মুরাদনগরে এনসিপি মানে আওয়ামী লীগ।মুরাদনগর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আমিন কাদের খান বলেন, আজ এনসিপির লোকজনের বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ ছিল। তাঁদের সমাবেশ চলাকালে ইটপাটকেল নিক্ষেপকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। যাঁরা উপদেষ্টার পক্ষে সমাবেশ করেছেন, তাঁদের লোকজন কর্মসূচির বিষয়ে লিখিতভাবে পুলিশকে জানিয়েছিল। তবে বিএনপি পাল্টা কর্মসূচি দিতে পারে, এমন তথ্য পুলিশের কাছে ছিল। এ জন্য পুলিশ সতর্ক অবস্থানে ছিল। তাঁরা ঘটনার বিষয় বিস্তারিত খোঁজখবর নিচ্ছেন। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।