তুরস্ক যেন মৃত্যু পুরিতে পরিনত হয়েছে। চারিদিকে যেন লাশের সারী । অত্ননাথ ও আহাজারীতে গোটা দেশ যেন কম্পিত। তুরস্ক এবং সিরিয়ায় আঘাত হানা বিধ্বংসী ভূমিকম্পে মৃত্যুর সংখ্যা ১১ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। সোমবারের ভূমিকম্পে ধ্বংস হয়ে যাওয়া ভবনের নিচে আটকে পড়া শত শত মানুষকে উদ্ধার করা কঠিন হয়ে পড়েছে। দেশ দুটির উদ্ধারকারীরা বলেছেন, তীব্র ঠান্ডা এবং বৈরী আবহাওয়ার কারণে লোকজনকে জীবিত উদ্ধারের সময় দ্রুতই ফুরিয়ে আসছে। ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে লোকজনকে উদ্ধারে সময়ের বিপরীতে লড়াই করতে হচ্ছে তাদের।বুধবার সর্বশেষ খবরে বলা হয়েছে, এখন পর্যন্ত ১১ হাজার ১০৪ জনের মৃত্যুর ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এর মধ্যে তুরস্কে আনুষ্ঠানিকভাবে আট হাজার ৫৭৪ জন মারা যাওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে সিরিয়ায় দুই হাজার ৫৩০ জন মারা গেছেন বলে জানানো হয়েছে। খবর সিএনএনের। তবে এ সংখ্যা আরও অনেক বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়ে আছেন হাজার হাজার মানুষ।
সোমবারের ওই ৭ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্প তুরস্ক ও সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলের হাজার হাজার ঘরবাড়ি, হাসপাতাল, স্কুল ধসিয়ে দিয়েছে, হাজার হাজার মানুষকে আহত করেছে, অগণিত মানুষ পরিণত হয়েছে উদ্বাস্তুতে।ওই ভূমিকম্পের কয়েক ঘণ্টা পর কাছাকাছি মাত্রার শক্তিশালী আরেকটি কম্পনও দেশদুটিকে নাড়িয়ে দিয়ে যায়।ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক, বৈরী আবহাওয়া, সম্পদ ও ভারী যন্ত্রপাতির স্বল্পতার কারণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পৌঁছানো ও সেখানে উদ্ধারকাজ চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে উদ্ধারকর্মীদের।দীর্ঘদিনের যুদ্ধে ইতোমধ্যে বিধ্বস্ত হয়ে যাওয়া তুরস্ক সীমান্ত লাগোয়া সিরিয়ার কিছু শহরে ভূমিকম্পের আঘাত অত্যন্ত তীব্র হয়েছে। এসব সীমান্ত এলাকায় প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতিও হয়েছে অনেক বেশি। সিরিয়ায় ভূমিকম্পে বেঁচে যাওয়া লাখ লাখ মানুষ এখন খোলা আকাশের নিচে রাস্তায় বাড়িঘরের ধ্বংসাবশেষ জ্বালিয়ে ঠান্ডা থেকে বাঁচার চেষ্টা করছেন। ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলগুলোতে আন্তর্জাতিক সহায়তা মাত্র পৌঁছাতে শুরু করেছে। আগামী ১৪ মে দেশটিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। তার আগে প্রাকৃতিক এই বিপর্যয় মোকাবিলা ও উদ্ধার তৎপরতার ধীরগতি নিয়ে এরদোয়ান প্রশাসনের প্রতি মানুষের ক্ষোভ দেখা গেছে। তবে ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত কাহরামানমারাস পরিদর্শনের সময় এই শহরটি আগামী এক বছরের মধ্যে পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।সোমবার স্থানীয় সময় ভোরের দিকে সিরিয়া ও তুরস্কে ৭ দশমিক ৮ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। তখন সেখানে লোকজন ঘুমিয়ে ছিলেন। স্মরণকালের এই ভয়াবহ ভূমিকম্পে হাজার হাজার বাড়িঘর ধ্বংস হয়েছে এবং অসংখ্য মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েছেন।কেন্দ্রস্থলের কাছের শহর তুরস্কের গাজিয়ানতেপ এবং কাহরামানমারাসে প্রচণ্ড ধ্বংসলীলা চালিয়েছে এই ভূমিকম্প। এই দুুই শহরের বেশিরভাগ ভবন ধসে পড়েছে।ধ্বংসযজ্ঞের ভয়াবহতায় তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান মঙ্গলবার দেশটির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় ১০টি প্রদেশে তিন মাসের জন্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন।কর্তৃপক্ষের তাৎক্ষণিক সাড়া না পেয়ে অনেক জায়গায় বাসিন্দারা কোনো উপকরণ ছাড়া খালি হাতেই জীবিতদের উদ্ধারে ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজে মরিয়া হয়ে নেমে পড়েন।বিভিন্ন দাতা সংস্থার কর্মকর্তারা সিরিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন; প্রায় ১২ বছরের যুদ্ধ শেষে দেশটি এমনিতেই চরম মানবেতর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। এদিকে সিরিয়া সীমান্তবর্তী হাতয়ের রাজধানী আনতাকিয়ায়য় উদ্ধারকারীর সংখ্যা এতই কম যে বাসিন্দারা
নিজেরাই ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজে নেমে পড়েছেন। তারা হেলমেট, হাতুড়ি, লোহার রড ও দড়ির জন্য আকুতি জানাচ্ছেন।ভূমিকম্পের ৩২ ঘণ্টা পর ৮ তলা এক ভবন থেকে ৫৪ বছর বয়সী গুলুমসার নামের এক নারীকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।এরপরই এক নারী উদ্ধারকর্মীদের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলেন, “উনি (উদ্ধার হওয়া নারী) যেখানে ছিলেন, তার পেছনের ঘরেই আমার বাবা ছিলেন। দয়া করে, তাকেও বাঁচান।”কিন্তু তা হওয়ার নয়। উদ্ধারকর্মীরা পরে তাকে বুঝিয়ে বলেন, সামনের দিক থেকে তারা ওই ঘরে পৌঁছাতে পারবেন না, যেতে হলে তাদের দরকার খননযন্ত্র, যা দিয়ে প্রথমে দেয়াল সরানো যাবে।তুরস্কের ভূমিকম্প দুর্গত এলাকাগুলোতে ১২ হাজারের বেশি উদ্ধার ও অনুসন্ধানকর্মী কাজ করছেন, তাদের সঙ্গে আছেন ৯ হাজার সেনা। ৭০টিরও বেশি দেশ তুরস্কে উদ্ধারকারী দল এবং অন্যান্য সহযোগিতা পাঠিয়েছে। কিন্তু পরিস্থিতির তুলনায় তা নগণ্য।এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ৭০টি দেশ তুরস্কে উদ্ধারকারী টিম ও জরুরি সাহায্য পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছে। প্রায় দুই ডজন দেশের প্রতিনিধিরা এরইমধ্যে উদ্ধার কার্যক্রমে যোগ দিয়েছে।অন্যদিকে সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে সাহায্য ও উদ্ধার কার্যক্রমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আশানুরূপ সাড়া মিলছে না বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এখন পর্যন্ত রাশিয়া, ইরান, ইরাক, আলজেরিয়া, কিউবা ও মরক্কো সিরিয়া সরকারকে জরুরি ত্রাণ সহায়তা পাঠিয়েছে। উত্তর কোরিয়া সরকার তাদের পাঁচটি বিমান সিরিয়া সরকারের সাহায্যার্থে পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে।রাশিয়া ও ইরান থেকে সাহায্যবোঝাই কমপক্ষে তিনটি করে বিমান সিরিয়ার সরকার নিয়ন্ত্রিত অংশে পৌঁছেছে। রুশ সেনাবাহিনীর ৩০০ সদস্য ও ৬০টি ভারী যন্ত্র ভূমিকম্পের দিন থেকে উদ্ধার কার্যক্রমে যোগ দিয়েছে। এছাড়া সিরিয়ার বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রিত অংশে ইসরায়েলসহ বেশকিছু দেশ এরইমধ্যে জরুরি সাহায্য পাঠিয়েছে।