পাকিস্তানের পেশোয়ারে মসজিদে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৩২ জন নিহতের খবর দিয়েছে দেশটির গণমাধ্যম। এছাড়া আহত হয়েছেন অন্তত ১৪৭ জন। সোমবার জোহরের নামাজের সময় স্থানীয় পুলিশ লাইন্স এলাকায় অবস্থিত মসজিদে এ বিস্ফোরণ ঘটে। তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) এ হামলার দায় স্বীকার করেছে। নিরাপত্তা বাহিনী ও হাসপাতাল সূত্রের বরাত দিয়ে জিও নিউজ এ তথ্য জানিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জোহরের নামাজের সময় এক আত্মঘাতী হামলাকারী এ বিস্ফোরণ ঘটায়। সে নামাজের সময় সামনের কাতারে অবস্থান করছিল। আহতদের স্থানীয় লেডি রিডিং হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। খবরে বলা হয়েছে, হামলায় মসজিদের ইমামও নিহত হয়েছেন। হামলার পর পেশোয়ার ছুটে গেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রানা সানাউল্লাহ। তাৎক্ষণিকভাবে প্রধানমন্ত্রীসহ এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিলাওয়াল ভুট্টো। হাসপাতাল সূত্র জানায়, বিস্ফোরণে ৩২ নিহত হয়েছে এবং আহত শতাধিক লোককে সেখানে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। আহতদের বাঁচাতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দেশের নাগরিকদের রক্ত দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট এলাকায় মেডিকেল রেড এলার্ট জারি করে বলা হয়েছে, সকল চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্টাফদের পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কর্মস্থলে অবস্থানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।এক প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, তিনি যখন মসজিদে ঢুকছিলেন তখন বিস্ফোরণ ঘটে। এটা ভয়াবহ বিস্ফোরণ ছিল। জোহরের নামাজ শুরু হওয়ামাত্রই বিস্ফোরণ ঘটে। মসজিদে ১২০ জনের মতো মুসল্লি ছিলেন; যার বেশিরভাগই পুলিশ সদস্য। এর আগে প্রাথমিকভাবে নিরাপত্তা বাহিনী জানায়, বিস্ফোরণে অন্তত ৫০ মুসল্লি আহত হয়েছেন। তবে আত্মঘাতী হামলাকারী বেঁচে আছেন কিনা, তাৎক্ষণিকভাবে তা জানানো যায়নি।ডন জানিয়েছে, বেলা পৌনে ২টার দিকে বিস্ফোরণ ঘটায় হামলাকারী। নিরাপত্তা বাহিনী ঘটনাস্থল ঘিরে রেখেছে এবং জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করেছে।
পাকিস্তানি তালেবান কারা?
আফগানিস্তানের ক্ষমতাসীন সশস্ত্র তালেবানগোষ্ঠীর মতোই পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক সরকারকে উচ্ছেদ করে নিজেদের সরকার গঠন করতে চায় তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)। পাকিস্তানজুড়ে শরিয়া আইন চালুর দাবিতে বেশ কয়েক বছর ধরে তৎপরতা চালিয়ে আসছে তেহরিক-ই-তালেবান। এর আগে কয়েকবার টিটিপি ও পাকিস্তানের সরকারের মধ্যে সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু প্রতিবারই ব্যর্থ হয়েছে সেসব উদ্যোগ।দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে এই গোষ্ঠীর সঙ্গে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। সর্বশেষ গত বছরের ৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত উভয়পক্ষের অস্ত্রবিরতি কার্যকর ছিল।
পাকিস্তানের নারী শিক্ষা অধিকার কর্মী ও শান্তিতে নোবেলজয়ী মালালা ইউসুফজাইকে হত্যাচেষ্টার মাধ্যমে পশ্চিমা বিশ্বে পরিচিতি পায় টিটিপি। রয়টার্সের তথ্যমতে, টিটিপির একের পর এক আত্মঘাতী হামলা ও বোমা হামলায় এরই মধ্যে পাকিস্তানের কয়েক হাজার সামরিক-বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন।
‘দুটি পুলিশ চেকপোস্ট পেরিয়ে মসজিদে যান হামলাকারী’
দেশটির সাংবাদিক কাইসার ব্যাখ্যা করে বলেন, পুলিশ লাইন্স এলাকাটি পেশোয়ারের ক্যান্টের অত্যন্ত স্পর্শকাতর এলাকায় অবস্থিত। এই এলাকায় ২৪ ঘণ্টাই আইনপ্রয়োগকারী বিভিন্ন সংস্থার ব্যাপকসংখ্যক সদস্য ও এফসি কর্মীরা উপস্থিত থাকেন।তিনি বলেন, খাইবার পাখতুনখোয়ার কাউন্টার টেরোরিজম ডিপার্টমেন্ট (সিটিডি) ও পুলিশের তদন্ত বিভাগের কার্যালয় এখানে অবস্থিত। সাধারণত পুলিশের এই সদর দফতরে এক হাজার পুলিশ কর্মী উপস্থিত থাকেন।পাকিস্তানি এই সাংবাদিক বলেন, ওই এলাকাটির ভেতরে যেতে হলে অন্তত দু’টি পুলিশি তল্লাশিচৌকিতে থামতে হয়। অন্তত তিনবার তল্লাশি এড়িয়ে বোমা হামলাকারী ভেতরে ঢুকতে সক্ষম হয়েছেন।তবে বোমাটি আগে থেকেই মসজিদে পেতে রাখা হয়েছিল নাকি এটি আত্মঘাতী হামলা— তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন দেশটির পুলিশ কর্মকর্তারা। বিস্ফোরণস্থলের আশপাশের সব সড়ক ইতিমধ্যে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ইসলামাবাদেও আইনশৃঙ্খলাবাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় থাকার নির্দেশ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।এদিকে, মসজিদে বিস্ফোরণের এই ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। এক বিবৃতিতে তিনি বলেছেন, মসজিদের ভেতরে বিস্ফোরণ প্রমাণ করে, হামলায় জড়িতদের ‘ইসলামের সাথে কোনও সম্পর্ক নেই।মসজিদে হামলার সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার করে তিনি বলেছেন, ‘এই সন্ত্রাসীরা পাকিস্তানকে রক্ষা করার দায়িত্ব পালনকারীদের লক্ষ্য করে ভীতি ছড়ানোর চেষ্টা করছে।দেশটির বিরোধীদলীয় নেতা ইমরান খান এক টুইটবার্তায় এই ঘটনাকে ‘সন্ত্রাসবাদী আত্মঘাতী হামলা’ উল্লেখ করে নিন্দা জানিয়েছেন। হতাহতদের পরিবারের প্রতি সহানুভূতি ও সমবেদনা প্রকাশ করেছেন তিনি।

